পবিত্র হজের প্রস্তুতি

পবিত্র হজের প্রস্তুতি

মোহাম্মাদ মোস্তাকিম হোসাইন : পবিত্র হজ্জ হচ্ছে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক ইবাদত। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে হজ্ব ব্রত পালন। আগামীকাল ১৪ জুলাই থেকে হজ্ব ফ্লাইট শুরু হবে যা আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। গত বছর ভিসা ও সৌদি মুয়াল্লিম জটিলতার কারণে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে হাজীগণ বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছিল। এ বছর যেন হাজীরা কোন বিড়ম্বনার শিকার না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি করা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। হ্জ্ব ইসলামের পঞ্চম রুকন। এটি একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। কেবলমাত্র ধনী মুসলমানদের ওপর হজ ফরজ। এটি সমগ্র মানবজাতির মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা ও ঐক্য সৃষ্টির প্রতীক।

 পবিত্র কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে মহান প্রভুর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্য বিশ্বের সুদূর প্রান্তসমূহ থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানগণ হৃদয়ভরা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আবেগজড়িত চিত্তে মক্কায় হাজির হয় এবং সম্পাদন করে হজের যাবতীয় কার্যাবলি। মূলত বিশ্ব মুসলিমের সর্বকালের সর্ববৃহৎ ইসলামি মহাসম্মেলন হলো হজ। হজ মুসলিম জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ঐক্য এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধের এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন। কারণ আমাদের দেশের হাজীগণ অনেকে হজ্জ নিয়ম নীতি জানে না। ফলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। হ্জ্ব যাদের ওপর ওয়াজিব: হজ্ব ওই সকল মুসলিম ব্যক্তির ওপর ফরজ যার পবিত্র মক্কা মদিনায় যাতায়াত ও হজের কাজ সম্পাদন করার মতো আর্থিক ও দৈহিক সামর্থ্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন-“মানুষের মধ্যে যার সেখানে (আল্লাহর ঘরে) যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।”(সূরা আলে ইমরান: ৯৭) উদ্ধৃত আয়াতে ‘মানইসতাতায়া’ শব্দটির বিশদ ব্যাখ্যা করে তাফসির ও ফিকহশাস্ত্রবিদগণ বলেন, নি¤েœাক্ত

শর্তাবলি যার মাঝে বিদ্যমান থাকবে তার ওপর হজ্ব ওয়াজিব। যেমন-
১. মুসলমান হওয়া। কেননা অমুসলিমের ওপর ইসলামি বিধিবিধান প্রযোজ্য নয়।
২. হজ ওয়াজিব হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে তথা ব্যক্তির স্বাধীন হওয়া। কেননা কোনো দাস-দাসীর ওপর হজ ওয়াজিব নয়।
৩. প্রাপ্তবয়স্ক ও স্থির মস্তিষ্ক হওয়া। কেননা নাবালেগের ওপর শরয়ী বিধান প্রযোজ্য নয়।
৪. সুস্থ হওয়া। স্বাস্থ্যগতভাবে পূর্ণ সুস্থ না হলে তার ওপর হজ ওয়াজিব নয়।
৫. দুষ্টিশক্তি সম্পন্ন হওয়া। কেননা অন্ধ ব্যক্তির ওপর হজ ওয়াজিব নয়।
৬. পথ খরচ থাকা। আর সম্পদের পরিমাণ ততটুকু হতে হবে, যাতে আসা যাওয়ার সমস্ত খরচের পর বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবার পরিজনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে পারে।
৭. হজে আসা যাওয়ার পথ নিরাপদ হওয়া, শত্রুমুক্ত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা।
৮. মহিলাদের সাথে স্বামী বা কোনো মহাররাম পুরুষ থাকা অর্থাৎ এমন পুরুষ যার সাথে ওই মহিলার বিয়ে হারাম।
৯. যানবাহনের সুবিধা থাকা।
১০. জ্ঞানবান হওয়া। কেননা পাগলের ওপর হজ ওয়াজিব নয়।
হজের সময় ঃ হজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। এর বাইরে হজ আদায় করা জায়েজ নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: “হজের মাসসমূহ সুবিদিত।”(সূরা বাকারা: ১৯৭) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি (রা.) বর্ণনা করেন যে-
হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন, হজের মাসসমূহ হচ্ছে শাওয়াল, যিলক্বদ এবং যিলহজের প্রথম ১০ দিন। তাফসিরে মাযহারিতে আছে হজ্জের মাস সাওয়াল হতে আরম্ভ হওয়ার অর্থ হচ্ছে এর পূর্বে ইহরাম বাঁধা জায়েজ নয়। ইমাম আযম আবু হানিফা (র.)- এর মতে অবশ্য হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মাকরৃহ হবে। সুতরাং সকল সামর্থ্যবানের জন্য জীবনে একবার হজ্ব পালন করা ফরজ। নতুবা গুনাহগার হতে হবে।
হজ্জ তিন প্রকার। ইফরাত, তামাত্তু, কিরান।
(ক) হজের ফরজ    
১. ইহরাম বাঁধা; ২. উকূফে আরাফা অর্থাৎ ৯ জিলহজ জোহরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সামান্য সময়ের জন্য হলেও আরাফায় অবস্থান করা;
৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা। অর্থাৎ ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হজের তাওয়াফ করা।
(খ) হজের ওয়াজিব:
১. ৯ জিলহজ রাতে মুজদালিফায় অবস্থান করা; ২. সাফা-মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করা;
৩. নির্দিষ্ট দিনগুলোতে জামারাতে (শয়তানকে) কংকর মারা; ৪. কিরান বা তামাত্তু হজকারীর জন্য কুরবানী করা; ৫. হালাল হওয়ার জন্য মাথার চুল মুন্ডানো বা ছাঁটা; ৬. মীকাতের বাহির থেকে আগমনকারীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা।
(গ) হজের সুন্নাত ঃ
১. ইহরাম বাঁধার পূর্বে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হওয়া; ২. ৮ জিলহজ মিনা ময়দানে অবস্থান করা; ৩. বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা; ৪. ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া; ৫. ১০,১১ ও ১২ জিলহজ রাতে মিনায় অবস্থান; ইত্যাদি। এ বছর থেকে সরকার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জেলায় জেলায় হজ্বে গমন ইচ্ছুকদের নিয়ে বিশেষ হজ্ব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। যা প্রশংসার দাবি রাখে।
৩) হজ্জের ফযিলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস:
রাসূল (সাঃ) বলেন,
১. যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হ্জ্জ করল এবং হজ্জ পালনে কোন প্রকার অশ্লীল কথা বলে নাই, কোন প্রকার পাপাচার করে নাই সে যেন সদ্য প্রসূত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরল। (মেশকাত)
২. হজ্জ পালনকারী কখনোও গরীব হয় না। (তিরমিযী)
৩. এক উমরা আদায়ের পর কোন ছোট খাট পাপ হয়ে থাকলে দ্বিতীয় উমরা উক্ত পাপের বিনিময় হয়ে যায়। আর কবুল হজ্জের বিনিময় বেহেশত ছাড়া আর কিছুই নহে (মেশকাত)।
৪. একজন হাজীর জন্য তাঁর চারিশত পরিবার অথবা নিজ পরিবারের চারিশত লোকের সুপারিশ কবুল করা হবে। (তারগীব)
৫. যে ব্যক্তি হজ্জে অথবা উমরার নিয়তে রওয়ানা হয়ে পতিমধ্যে মারা গেল, তিনি কোন প্রকার জবাবদিহি ও হিসাবের সম্মুখীন হবেন না। তাকে বলা হবে বেহেশতে চলে যাও। (বাইহাকী)
৬. রাসূল (সা.) হজ্জ পালনকারীর জন্য দোয়া করবেন “হে আল্লাহ! তুমি হজ্জকারিকে ক্ষমা করে দাও এবং তিনি যাদের জন্য সুপারিশ করবেন তাদেরকেও ক্ষমা করে দাও।” (মিশকাত)
হজের প্রস্তুতির জন্য কতিপয় নির্দেশনা :
১. প্রাক-নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (ঘওউ) এবং নিবন্ধনের জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (গজচ) থাকতে হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ হজের দিন হতে পরবর্তী ন্যূনতম ৬ মাস থাকতে হবে।
২. মহিলা হজযাত্রী কেবলমাত্র শরিয়তসম্মত মাহরাম অবশ্যই সাথে রাখবেন।
৩. সরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীকে হজ অফিস, আশকোনা, ঢাকা এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীকে অনুমোদিত হজ এজেন্সীর মাধ্যম সৌদি দূতাবাস হতে ইস্যুকৃত হজ ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।
৪. বিমান টিকিট, পাসপোর্ট, হেলথ কার্ড ও বৈদেশিক মুদ্রা ইত্যাদি অবশ্যই হজযাত্রীর নিজের কাছে সাবধানে রাখতে হবে।
৫. সৌদি আরবে আইডি কার্ড, কব্জিবেল্ট, মোয়াল্লেম কার্ড, হোটেলের কার্ড ইত্যাদি সার্বক্ষণিক শরীরের সাথে বেঁধে রাখতে হবে; যাতে হজযাত্রী হারিয়ে গেলে বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে (আইডি কার্ড, কব্জিল্টে, হোটেলের কার্ড) দেখে সহজে সনাক্ত করা যায়। ৬. বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীর ট্রলিব্যাগে হজযাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, মোয়াল্লেম নম্বর, হজ এজেন্সীর নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং সৌদি আরবে সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সীর প্রতিনিধির মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানা ইংরেজিতে লেখা বাধ্যতামূলক।৭. প্রত্যেক হজযাত্রীকে হজে গমনের কমপক্ষে ১০ দিন পূর্ব হতে অনূর্ধ্ব ৩ বছরের মধ্যে ভেকসিন গ্রহণ মেডিকেল বোর্ডে অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য স্বাস্থ্য পরিক্ষা, মেনিনজাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। উল্লেখ্য যে, ৭০ বছর বা ততোধিক বয়স্ক হজযাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বোর্ডের নিকট হতে বিশেষ স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক।৮. ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ কোন ক্রনিকরোগি প্রেসক্রিপসনসহ অবশ্যই ৫০ দিনের ঔষধ সঙ্গে বহন করবেন। প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র বহনের ক্ষেত্রে রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।

৯. ব্যাগ/লাগেজে কিংবা কারো নিকট সামান্যতম কোন প্রকার মাদকদ্রব্য পাওয়া গেলে সৌদি আইন অনুযায়ী শাস্তিভোগ করতে হবে।
১০. সৌদি আরবে হজযাত্রীর অবস্থানকাল সর্বোচ্চ ৪৫ দিন। এয়ারলাইন্স কর্তক হজযাত্রীর ফিরতি ফ্লাইটের বোডিং পাস বাংলাদেশেই প্রদান করা হবে। কোন হজযাত্রী বোডিং পাস হারিয়ে ফেললে (ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে) বাংলাদেশ হজ অফিস, মক্কা/মদিনা/জেদ্দার প্রত্যয়ন সাপেক্ষে ডুপ্লিকেট বোডিং পাস ইস্যু করা হবে।
১১. মদিনা-আল-মুনাওয়ারা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় জুল-হুলাইফা মিকাতে ইহরাম পরিধান ও নিয়তের জন্য সময় নষ্ট করা যাবে না বরং ইসলামী শরীয়তমতে বাসা থেকে গোসল করে ইহরাম পরিধান করে আসতে হবে এবং মিকাতে এসে নামাজ আদায়পূর্বক নিয়ত করতে হবে। ১২. মদিনা-আল-মুনাওয়ারার ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানসমূহ জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট হজযাত্রী নিয়ে মদিনাস্থ আদিল্লা অফিসের মাধ্যমে যেতে হবে নতুবা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা অনির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে পারে। ১৩. সৌদি আরবে পৌঁছে মোবাইলের সিম সংগ্রহ করা একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। সহজে সিমকার্ড পেতে আপনাকে পাসপোর্টের পিছনে লাগানো নাম্বর/কোড অবশ্যই আপনার সাথে রাখতে হবে।

১৪. হজ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকার কর্র্তৃক জারীকৃত সকল বিধি বিধান হজযাত্রী ও সকল এজেন্সী মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। হজ সংক্রান্ত যে কোন জরুরি প্রয়োজনে ঢাকা ও সৌদি আরবস্থ (মক্কা/মদিনা/জেদ্দা) হজ অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। পরিশেষে এ কথা সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত যে, হজ্জ এমন একটি ইবাদত, যার ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও শিক্ষার তুলনা নেই। পৃথিবীর কোণে কোণে ইসলামের শান্তির বার্তা পৌছানোর জন্য এতদপেক্ষা শক্তিশালী উপায় আর হতে পারে না। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শান্তি শৃঙ্খলা, খোদাপ্রেম, একক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধকরণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হজের ভূমিকার বিকল্প নেই। এজন্যই আল্লাহ তাআলা এ মহতী ইবাদত অনুষ্ঠানকে বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি হাজিগণ সুস্থ শরীরে হজ্জের যাবতীয় নিয়ম কানুন পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করুন এটাই আজকের প্রার্থনা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বারবার খানায়ে কাবা তাওয়াফ ও রাসুলের (সা:) রওজায় সালাম করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: কলামিষ্ট-প্রভাষক
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮