নীলফামারীতে গ্রাম্য সালিশে তরুণীর মাথা ন্যাড়া : আটক ৩

নীলফামারীতে গ্রাম্য সালিশে তরুণীর মাথা ন্যাড়া : আটক ৩

নীলফামারী প্রতিনিধি: গ্রাম্য সালিশে প্রায়শ্চিত্তের অজুহাতে জোর করে  লক্ষ¥ী রাণী (১৭) নামের এক তরণীর মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে গ্রাম্য মাতবররা। গত সোমবার রাতে ঘটনাটি ঘটে নীলফামারী জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের চাঁদেরহাট কলেজপাড়া গ্রামের। এদিকে গতকাল বুধবার সকালে ঘটনার সাথে জড়িত তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।   প্রেমের টানে বাড়ি ছেড়ে ভিন্ন ধর্মের এক ছেলের সাথে ঘর বাঁধার অপরাধে লক্ষ্মী রাণী রায়ের মাথা ন্যাড়া করে। হিন্দু শাস্ত্রমতে প্রায়শ্চিত্ত করা হয়েছে দাবি সালিশে অংশ নেয়া ওই গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মহৎ প্রধানদের।এলাকাবাসী জানায়, গ্রামের মৃত ধীরেন্দ্র নাথ রায়ের মেয়ে লক্ষ্মী রাণী রায় প্রেমের সম্পর্ক ধরে ২ জুলাই নিজ বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী কচুকাটা ইউনিয়নের দুহুলী গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে অটোরিক্সা চালক রবিউল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে উঠে। মেয়েটিকে নিজ বাড়িতে  ফেরত আনতে গত ৯ জুলাই রাতে রবিউলের বাড়িতে যায়  মেয়েটির পরিবার। সেখানে  দু’পক্ষের সমঝোতায় রাতে বাড়িতে ফেরত আনা হয় লক্ষ্মী রাণীকে। এরপর  ভোর চারটার দিকে লক্ষ্মী রাণীর প্রতিবেশীরা প্রায়শ্চিত্তের নামে তার মাথা ন্যাড়া করে দেয়।

লক্ষ্মী রাণী রায় জানায়, আড়াই বছর আগে বাবা মারা যায়। বাবার অবর্তমানে ২০১৩ সাল থেকে জেলা শহরের পরচুলা তৈরির একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করি। বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়া আসার পথে পরিচয়ের সূত্র ধরে অটোবাইক চালক রবিউল ইসলামের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে দেড় বছর আগে। সেই সূত্র ধরে গত ১ জুলাই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে রবিউলকে বিয়ে করি এবং ২ জুলাই নিজবাড়ি ছেড়ে রবিউলের বাড়িতে ওঠি। সেটি দুই পরিবার মেনে না নেওয়ায় গত ১০ জুলাই রাতে রবিউলের বাড়িতে সালিশের বৈঠক হয়। সালিশের মাধ্যমে আমাকে বাবার বাড়িতে ফেরত আনা হয়। লক্ষ্মী রাণী রায় অভিযোগ করে বলেন, আমাকে ফেরত আনার পর প্রতিবেশী লোকজন আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেন। এরপর আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা আমার মাথা ন্যাড়া করে দেন। রাজি না হওয়ায় মারধরও করা হয় আমাকে। আমি তাদের সব কথা মানতে রাজি আছি, কিন্তু মাথা ন্যাড়ার বিষয়টি মানতে পারছি না।  এসময় ওই তরুণীর দিদিমা বিজো বালা রায় বলেন, মেয়েটাতো নাবালক, তাকে ধীরে-আস্তে  না বুঝিয়া ধর্মের প্রায়শ্চিত্ত করা নামে সবাই জোর করে নাড়িয়া করে দিলো। এটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নাড়িয়া না করেও ধর্মের প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। সালিশে অংশ নেওয়া প্রতিবেশী বিবেকানন্দ রায়, কনক চন্দ্র রায়, সুধীর চন্দ্র রায়, সুরেশ চন্দ্র রায় বলেন, ওই তরুণী হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলিম হয়েছিল। সেখান থেকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আনার জন্য প্রায়শ্চিত্তের অংশ হিসেবে তার মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে। এখন অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতি চলছে। এটা হিন্দু ধর্মের রীতি-নীতি, এলাকার হিন্দু সমাজের লোকজন উপস্থিত থেকে ওই বিধান দিয়েছেন।

এদিকে লক্ষ্মী রাণী রায়ের মাথা ন্যাড়া করা কাজে অংশ নেওয়া সদানন্দ রায় জানান, সমাজের সকল লোকজনের নির্দেশে আমি লক্ষ্মী রাণীর মাথা ন্যাড়া করি। সমাজ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক। এমনকি আমিও যা করেছি তাও সঠিক। এখানে  কেউ অপরাধী নয়। লক্ষ্মী রাণীর মা বুলোবালা বলেন, মেয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান ধর্মে গিয়েছিল। তাকে প্রতিবেশীরা ফিরিয়ে এনেছে। মাথা ন্যাড়া করে প্রায়শ্চিত করে তাকে প্রতিবেশীরা গ্রহণ করে নিয়েছে সমাজে। এনিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই।  নীলফামারী কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের পুরোহিত অশোক কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, সনাতন হিন্দু ধর্মে মাথা ন্যাড়া করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। সে স্বইচ্ছায় প্রায়াশ্চিত্ত করতে চাইলে বিধান মতে চুলের অগ্রভাগে এক থেকে দেড় ইঞ্চি কেটে ফেলে তার প্রায়শ্চিত্ত করবে। মানবাধিকার কমিশন নীলফামারী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান দুলাল বলেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রায়শ্চিত্তের নামে মেয়েটির মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া চরম মানবাধিকার লংঘন করা হয়েছে। যারা এই মানবাধিকার লংঘন করেছে তাদের প্রত্যেকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা উচিৎ। নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাবুল আকতার বলেন, এ ঘটনায় দ্বীনবন্ধু রায়, সদানন্দ রায় ও পুষ্পরায়কে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হয়নি।