* খালেদা জিয়াকে কোর্টের মাধ্যমেই মুক্তি পেতে হবে * মিয়ানমার জঘন্য কাজ করেছে * ইভিএম-এর পক্ষে মত * সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ

নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই : প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই : প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণ চাইলে নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই। ষড়যন্ত্র আছে, ষড়যন্ত্র থাকবে, জনগণ সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করবে। কারও হুমকিতে ঘরে বসে থাকলে চলবে না, কাজ করতে হবে। যতক্ষণ সাহস আছে ততক্ষণ মানুষের জন্য কাজ করে যাব। নেপালে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে গতকাল রোববার বিকাল ৪টায় গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন জোট গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা থেকে সরে গেলে যারা একবার ক্ষমতায় বসে তারা আর ছাড়তে চায় না। মার্শাল ল, সামরিক শাসন ও কেয়ারটেকার সরকারের এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চ আদালত এ বিষয়ে একটি রায় দিয়েছে। যদি সরকার মনে করে, এ সুযোগ পরপর দুবার নিতে পারে। তবে সংসদ সে সুযোগ নেয়নি। একটা সরকার থেকে আরেকটা সরকারে যাওয়ার যে সময় ওই সময়ে যেন কোনও ফাঁক না থাকে সেজন্য এটা করা। এ বিষয়ে আমি ভারত ও নেপাল সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বিশ্বের প্রত্যেকটা দেশে এ ব্যবস্থা আছে। শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়াকে কোর্টের মাধ্যমেই মুক্তি পেতে হবে। অথবা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

তাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। এতিমদের টাকা লুটপাটের মামলাটি কিন্তু আমাদের সরকারের দেওয়া না। মামলাটি তারই প্রিয় ব্যক্তিরা দিয়েছেন। উনার পছন্দের লোকদের আমলেই মামলাটি হয়েছে। মামলাটি দশ বছর ধরে চলেছে। এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আমাদের সরকারের কি করার আছে? আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ এটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার। আমাদের পরীক্ষা দেখতে হবে। ২০১০ সালে বাংলাদেশে চালুর পর এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেই কেবল ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য ইসি ইতোমধ্যে নির্বাচনী আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। এক-তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের একটি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ পেলেও সিইসি বলেছেন, তারা এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, ইভিএমে ভোট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই হয়। ইভিএমটা নিয়ে আসার জন্য আমিই কিন্তু সবসময় পক্ষে ছিলাম। এখনও পক্ষে আছি।

 আমরা চাচ্ছি, কিছু কিছু জায়গায় শুরু হোক, সীমিত আকারে এটা দেখুক। প্রযুক্তির যদি কোনো সিস্টেম লস হয় কি না, সেটা দেখা যাক। সেটা হলে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে। এটা এমন না যে এটাই শেষ কথা। আমরা সীমিত আকারে শুরু করি, প্রযুক্তির ব্যবহার। বিএনপি বলছে, বিশ্বের ৯০ ভাগ দেশেই ইভিএম চালু নেই, কয়েকটি দেশ চালু করার পর আবার পিছু হটেছে। শেখ হাসিনা পাল্টা বলেন, কারচুপি করতে পারবে না বলে বিএনপি ইভিএমে আপত্তি জানাচ্ছে। কারণ তাদের জন্মটাই কারচুপির মাধ্যমে। তারা আবার কারচুপির কথা বলে। ইভিএম হলে সেই কারচুপিটা করতে পারবে না। একের বেশি ভোট দিতে পারবে না, সিল মারতে পারবে না- সেজন্য তারা আপত্তি জানাচ্ছে। এটা স্পষ্ট। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে সবক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অংশ হিসেবেই ভোট দেওয়ায় ইভিএম প্রবর্তনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সবচেয়ে সুবিধা হল, যেই মানুষটা যাচ্ছে, একটা টিপ দিয়ে ভোট দিয়ে আসছে এবং সাথে সাথে রেজাল্টটা পেয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি আমলে ভোট কারচুপির কথাও বলেন শেখ হাসিনা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ভোটে যে কারচুপির রাজনীতি, সেটা তো জিয়াউর রহমানই প্রথম এনেছে এদেশে। কারণ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে, সেটাকে বৈধ করতে চেয়েছে সে। আজকে বিএনপি যখন সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে।

 তারা তাদের জন্মস্থানটা খোঁজ করুক। কোথায়, কীভাবে হয়েছে দেখুক। তাদের জন্মের সূত্রটা, লগ্নটা মনে করুক। শুভ না অশুভ লগ্ন নিয়ে তারা জন্ম নিয়েছে। খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটের কথা যদি কারও মনে থাকে, তারা কী করেছিল। ঘোষণা দিয়েছিল দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী। ১৫ দিনও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। জনগণ চাইলে তো থাকতে পারত। কারচুপি করে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিল বলে বাধ্য হয়েছিল পদত্যাগ করতে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতারা সরকারকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে এলেও তেমন সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা যে অপমান করেছে, তারপর তাদের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না, আপনারা যে যা-ই বলুন, আমি অন্তত বসব না। বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক বড় প্লাটফর্মের আলোচনায় মিয়ানমারের সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি এসেছে কি-না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিমসটেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। এছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়েছে। সম্মেলনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

 আমরা নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছি, বাংলাদেশ বিমসটেকের মতো সহযোগিতামূলক প্লাটফর্মের সঙ্গে কাজ করে যাবে। ভুয়া ছবি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জঘন্য কাজ করেছে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  তারা (মিয়ানমার) এভাবে ভুয়া ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু এটা তারা কার কাছ থেকে শিখলো? আমাদের দেশেও তো হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, একেবার কাবা ঘরের সামনে ব্যানার ধরার ছবির মিথ্যাচারও আমরা দেখেছি। সুতরাং এসব মানুষের কাছে ধরা পড়ে যায়। মিয়ানমার সরকারও ধরা পড়ে গেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ে ভুয়া তথ্য ও ছবি দিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী; যেটি ধরা পড়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে। ওই বইয়ে থাকা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও তথ্য ভুয়া। এতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানের বর্বরতার ছবিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা কর্তৃক বৌদ্ধ নিধনের ছবি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

 রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি দিয়ে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রোপাগান্ডামূলক একটি বই প্রকাশের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এভাবে ভুয়া ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনা বলেন, বিমসটেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। এছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও এ নিয়ে কথা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত ৪র্থ ‘বে অব বেঙ্গল ইনেসিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল এন্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’ (বিমসটেক) সম্মেলনে যোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার নেপাল যান প্রধানমন্ত্রী। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। এ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমসটেক সম্মেলন শেষে শুক্রবার ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।