দেশকে মাদকমুক্ত করতেই হবে

দেশকে মাদকমুক্ত করতেই হবে

মীর আব্দুল আলীম: দেশ কেন মাদক থেকে মুক্ত হতে পারছে না? সাম্প্রতিককালের আলোচিত ‘বন্দুকযুদ্ধও’ মাদকের বিস্তার রোধে ব্যর্থ। গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। শুধু আইন প্রয়োগ এবং গুটি কয়েক মাদক বিক্রেতাকে নির্মূলের মধ্য দিয়ে মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। সামাজিক গণসচেতনতা তৈরির মধ্য দিয়ে মাদককে পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীসহ ঝুঁকিপূর্ণ সব জনগোষ্ঠীকে সচেতন না করা গেলে মাদকের চাহিদা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সমাজে মানুষ মাদকের অপব্যবহার এবং কুফল সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হবে মাদকের চাহিদা তত কমে আসবে।

মাদকরোধে মাদকের গডফাদারদের আগে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে মাদকের ব্যাপারে আরও বেশি জবাবদিহি হতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মাদক রোধে হুঙ্কার দিলেও মাঠ পর্যায়ে এদেরই কিছু লোকজন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রায়শই পাওয়া যায়। প্রকৃত পক্ষে মাদক সর্বগ্রাসী হয়ে উঠলেও এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার হচ্ছে না। গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যারা ধরা পড়ছে, তাদের গডফাদাররা এখনও বহাল তবিয়তে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের বিচার হচ্ছে না। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। অপরাধীরা প্রভাবশালীদের সহায়তায় জামিনে বেরিয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। এদিকে তরুণ সমাজও নানা কারণে ঝুঁকছে মাদকে। সেই কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। বিক্ষিপ্ত কিংবা অগোছালোভাবে নয়, এখন দরকার সমাধানের সঠিক উদ্যোগ। ইয়াবা-ফেনসিডিলসহ মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, প্রতিরোধে করণীয় কী তা নিয়ে সকল মহলকে কাজ করতে হবে। তাহলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ হবে। কি দেখছি আমরা? মাদকে সারা দেশ সয়লাব। মানুষ মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকাসক্তদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পুলিশও যেন অসহায়। প্রধানমন্ত্রীর মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরোটলারেন্স ঘোষণার পরও মাদক নির্মূল করতে পারছে না  সরকারি বিভিন্ন সংস্থা।

প্রশ্ন হলো কোথায় আছি আমরা? দেশে মাদক ব্যসায়ীরা কি এতই শক্তিশালী যে তাদের কাছে আমরা হেরে যাব। বলেছি মাদক ব্যবসায়ীরা সংখ্যায় অনেক নয়, আমাদের চেয়ে শক্তিশালীও নয়। আমরা কেন পরাজয় মানবো। সারা দেশে জনগণের মধ্যে আওয়াজ উঠুক মাদকের বিরুদ্ধে। অনেক ভালো মানুষ আছে সমাজে। সবাই সমাজটাকে সুন্দরভাবে গড়তে চায়। মাদক নিয়ন্ত্রণে ভুমিকা রাখতে চায় কিন্তু সমস্যা একটু আছে। রাজনৈতিক সমস্যা। মাদক ব্যসায়ীরা, সন্ত্রাসীরা রাজনীতির আশ্রয়ে থাকে; নেতাদের প্রশ্রয়ে থাকে। তাই ওরা শক্তিশালী হয়। এসব মাদক ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বড় বড় নেতাদের সাথে নিজেদের ছবি দিয়ে এলাকা সয়লাব করে।

কেউ কেউ পুলিশের সাথে চলে। এখানেই পোয়াবারো। এটা কেন হবে? মাদক ব্যবসায়ী, খুনিরা আপনাদের (নেতাদের) ছবির সাথে ছবি দিয়ে পোস্টার করে অপকর্ম করবে আপনারা চুপ করে থাকবেন তা হয় না। পুলিশ কেন মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক গড়বে? এখানেই সব সমস্যা! তাই দেশে জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। মাদকের কেনাবেচাও বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। দেশের প্রতিটি সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীতেও বসছে মাদকের খোলা হাটবাজার। লুকোচুরি নয়, বরং প্রকাশ্যেই বেচাকেনা চলছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও পুলিশের পৃথক পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী ২০০ গডফাদারের তত্ত্বাবধানে এক লাখ ৬৫ হাজার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার সমন্বয়ে দেশব্যাপী মাদক-বাণিজ্যের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ চক্রের সদস্যরা ঘাটে ঘাটে টাকা বিলিয়ে সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। মাঝে মধ্যে কোথাও কোথাও প্রশাসনিক অভিযান পরিচালিত হলেও তা মাদক নেটওয়ার্কে কোনো রকম ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। বরং পুলিশের পাঁচ শতাধিক সদস্য ও বিভিন্ন পর্যায়ের সহ¯্রাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মিকে উল্টো মাদক-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন তথ্যই প্রকাশ করেছে দেশের একটি জাতীয় দৈনিক।

একটি ভয়ংকর তথ্য হলো- ২০২০ সালের মধ্যে দেশে এক কোটি লোক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়বে, এমন আশংকা মাদকাসক্তি নিরাময়ের কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের মতে, প্রতি বছর শুধু নেশার পেছনেই খরচ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা এই মুহূর্ত থেকেই পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্?বান জানান। এ ক্ষেত্রে দেশজুড়ে একযোগে পুলিশি সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। আসলেই এর বিকল্প নেই। মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে। দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে সজাগ থেকে কাজ করতে হবে। সরকারকে বিষয়টি ভাবনায় নিয়ে আরও কঠোর হতে হবে। ব্যর্থতার কথা বললে চলবে না। মাদক নির্মূলে আমাদের সফল হতেই হবে। দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না? আমি বলবো, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন, কি করছেন তারা? মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্ত পথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

দেশের প্রভাবশালীদের ছত্র ছায়ায় মাদকদ্রব্য বিকিকিনির বিষয়টি এ দেশে বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য আটক ও এর সঙ্গে জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা ‘গডফাদার’দের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না। এ কথা সত্য যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রকট রূপের পেছনে মাদক অন্যতম বড় একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। খোদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক বিকিকিনি হয়। আর এর অর্থের বড় একটি অংশ যায় কারারক্ষীদের পকেটে। বাকি অংশ কয়েদি এবং মাদক ব্যবসায়ীরা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। কারাগার মাদক ব্যবসার নিরাপদ স্থান হলে এর মতো উদ্বেগজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?

আমাদের বর্তমান সমাজ জীবনে মাদকের ব্যবহার সবাইকেই উদ্বিগ্ন করেছে। এর বিষাক্ত ছোবল অকালে কেড়ে নিচ্ছে অনেক প্রাণ। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণী হচ্ছে বিপথগামী। এ থেকে পরিত্রাণের আশায় ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন (১৯৯০ সালের ২০ নং আইন) প্রণীত হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ওই আইন ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনের ২(ঠ) ধারায় মাদকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ভারতে তৈরি ফেনসিডিল সিরাপ আমাদের দেশে মাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই সিরাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আফিম থেকে উদ্ভূত কোডিন, এই কারণেই ফেনসিডিল সিরাপ সেবন করলে মাদকতা আসে। তাই ফেনসিডিল সিরাপ মাদক হিসেবে পরিচিত। অ্যালকোহল ব্যতীত অন্য কোনো মাদকদ্রব্যের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি-রফতানি, সরবরাহ, ক্রয়, বিক্রয়, ধারণ, সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, প্রয়োগ ও ব্যবহার ওই আইনের ৯ ধারায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর নবম দশকে (১৯৮১ থেকে ১৯৯০ সাল) বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মাদকের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বিদেশ থেকে আসা মাদক সম্পর্কিত অপরাধের বিচার করা হতো ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুসারে। সেখানে শুধু শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরা পথে আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য দেশে নিয়ে আসা বা নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধেই আসামির বিচার হতো। জনজীবনে ব্যাপক ক্ষতি সাধনকারী এই মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্য ওই আইন পর্যাপ্ত ছিল না। তাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৯০ সানে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি তারিখ থেকে এ আইন কার্যকর হয়। কিন্তু কুড়ি বৎসরেরও অধিককাল পথপরিক্রমায় মাদকদ্রব্য ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। এর ব্যবহার এবং প্রসার বেড়েই চলেছে। অভিভাবকরা আজ চিন্তিত তাদের সন্তানদের মাদকাসক্তি নিয়ে। মাদকের হিংস্র ছোবল থেকে সারা জাতি চায় আত্মরক্ষা করতে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ হয়নি বলেই আজ মাদক নিয়ে এত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বেড়েছে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ।

আশির দশকে বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার শুরু হয় মর্মে বিভিন্ন তথ্য মেলে। এ সময় লুকিয়ে-চুরিয়ে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক বিক্রি করা হতো। মাদক বিক্রি এখন আর অতটা গোপনে নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজধানীতে ডিজে পার্টির নামে বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় মাদকের রমরমা আসর বসে। এখানে সাধারণত ধনী পরিবারের তরুণ-তরুণীদের যাতায়াত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ-তরুণীরাই মূলত মাদকের নেশায় বুঁদ। মাদক এখন আর অলিতে-গলিতে নয়, এর বিস্তার ঘটেছে ভদ্র সমাজে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এমনকি রাষ্ট্রের সুরক্ষিত নিরাপত্তাবলয়ে বেষ্টিত কারাগার অভ্যন্তরেও মাদকের বেচাকেনা চলে। কারাবেষ্টনীতে মাদকের নিরাপদ বিস্তারের ঘটনাকে শর্ষের মধ্যে ভূত বলেই অভিহিত করা যায়। এ কথা সত্য যে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন শুধু নগর-মহানগরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রামবাংলা পর্যন্ত মাদক এখন সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। তবে মাঝে মধ্যে মাদকদ্রব্য বহনের দায়ে কেউ কেউ ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে।

প্রশাসনের কেউ কেউ যে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, কারাভ্যন্তরে মাদকের প্রসারতাই এর প্রমাণ। দৃশ্যের আড়ালে এই যে অদৃশ্য মহাশক্তিধর চক্রটির জন্যই মাদকের ক্রমবিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। সর্ষের ভেতরে ভূত রেখে যেমন ভূত তাড়ানো যায় না, মাদক যারা রোধ করবে তাদের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে যুক্ত হলে মাদক ব্যবসা রোধ কতটা সম্ভব? সুতরাং আমরা মনে করি মাদক সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে সরকারকে কঠোরতা দেখাতে হবে।
লেখক ঃ সাংবাদিক,  কলামিষ্ট ও গবেষক।
[email protected]
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮