গ্রামীণ উন্নয়ন ও পারিবারিক সঞ্চয়

গ্রামীণ উন্নয়ন ও পারিবারিক সঞ্চয়

মো. ওসমান গনি :দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সঞ্চয়ে উৎসাহিতকরণ সরকারের অন্যতম একটি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম। গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যবহারের লক্ষ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক গঠিত হয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়মিত বার্ষিক প্রকাশনা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বর্ণনা করা হয়েছে যে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এ স্থায়ী দারিদ্র্য বিমোচন মডেলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নিজস্ব পুঁজি সৃষ্টি এবং এর স্থায়ী ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি ও অকৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে আয়বর্ধন। উল্লেখ্য, মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয় ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে সারা দেশে খানা বা পরিবার পিছু গড় আয় বৃদ্ধির পরিমাণ আড়াই গুণের উপরে ছিল। গ্রামে এ বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় তিন গুণ এবং শহরে দ্বিগুণ। তবে আয় বৃদ্ধির হারের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির হার সামগ্রিকভাবে বেশি ছিল। সারা দেশে ২০০০ সালে পরিবার প্রতি মাসিক গড় ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাসিক আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ। এ গড় ব্যয় ২০১৬ সালে আয়ের ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে গ্রামে মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ মাসিক আয়ের ৮৮ শতাংশের ওপর থেকে ১০৬ শতাংশ এবং শহরে প্রায় ৭৫ থেকে ৮৭ শতাংশের উপরে পৌঁছে।

গ্রামে পারিবারিক আয়ের তুলনায় ব্যয় সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য বাবদ শহরের তুলনায় গ্রামে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হয়। এ ব্যয় বৃদ্ধিতে হয়তোবা পারিবারিক সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে। গ্রামের পরিবারগুলো আর্থিক সঞ্চয় থেকে সরে এসে ভৌত সঞ্চয়ে ঝুঁকে পড়তে পারে। কারণ কোনো ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (মাইক্রো ফিন্যান্স বা ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট) অর্থ জমা প্রদানকারী পরিবারের সংখ্যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে বৃদ্ধির হার শহরের তুলনায় গ্রামে কম ছিল। তবে সঞ্চয়ের জন্য কোনো অনিয়মিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা প্রদানকারী পরিবারের সংখ্যা গ্রামে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে নেমে আসে। একই সময়ে শহরে এ সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সারা দেশে এ সংখ্যা কমে যায়। গ্রাম ও শহরে বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের সামান্য অংশ সঞ্চয়ে ব্যবহার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এদিকে গ্রামে গড়পড়তা ঋণ গ্রহণের পরিমাণ শহরের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবার প্রতি গ্রামে ঋণ গ্রহণ ২০১০ সালে ২২ হাজার টাকার কাছাকাছি থেকে প্রায় ৯ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সালে ৩১ হাজার টাকার উপরে পৌঁছেছে। শহরে একই সময়ে ৫৪ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ হাজার টাকার কাছাকাছি হয়েছে। সার্বিক ঋণগ্রহীতার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশিই থেকে গেছে। দেশব্যাপী ২০১০ সালে মোট পরিবারের ৩২ শতাংশের ওপর ঋণ গ্রহণ করলেও ২০১৬ সালে তা প্রায় ৩০ শতাংশে কমে এসেছে। একই সময়ে গ্রামে ৩৫ শতাংশের ওপর থেকে প্রায় ৩৩ শতাংশে এবং শহরে ২৪ শতাংশের নিচে থেকে ২২ শতাংশের কাছাকাছি হয়েছে।

এমনিতেই সঞ্চয়ী পরিবারের সংখ্যা কম। জনগোষ্ঠীর খুব কমসংখ্যক সঞ্চয় করতে সক্ষম। গড় সঞ্চয়ের পরিমাণও কম। বিশেষ করে গ্রামে। কৃষি ও অকৃষি শ্রমিকদের সঞ্চয়ের প্রতি কম আগ্রহ থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে ব্যয় করতে হয়। সঞ্চয়ের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব থাকে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে সারা দেশে মোট পরিবারের ১৫ শতাংশের উপরে ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা করে। গ্রামে ও শহরে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৭ ও ১২ শতাংশের উপরে। সারা দেশে গ্রাম ও শহরে অনিয়মিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা প্রদানকারীর সংখ্যা ছিল মোট পারিবারের ৬ শতাংশের নিচে। রেমিট্যান্স থেকে ২০১৬ সালে সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল সারা দেশে গড়পড়তা মোট পরিবারের ২ শতাংশের কাছাকাছি। শহর ও গ্রামে ছিল যথাক্রমে মোট পরিবারের প্রায় ৩ ও দেড় শতাংশ। গ্রামে উপার্জনের তুলনায় ব্যয় অধিক হলে এবং সঞ্চয়ী পরিবার সংখ্যা কমে গেলে জাতীয় সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব আসতে পারে। পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবে বেশি ব্যয় হয়ে থাকে। যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের পর আয়ের অবশিষ্টাংশ সাধারণত পারিবারিক সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী শহরে এ সঞ্চয়ে জমা প্রদানে পরিবার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও গ্রামে এর ব্যতিক্রমের কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। গ্রামে পরিবারগুলোয় আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে গেছে। অধিক ব্যয়ের প্রবণতা বেড়েছে বা ব্যয় করতে হচ্ছে। ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। সঞ্চয়ে আগ্রহী হলেও সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। নগদ হিসাবে জমা রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ের জন্য জমা প্রদানকারী পরিবার সংখ্যা বৃদ্ধি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। সঞ্চয় ও অর্থায়নের অভাব হলে লাভজনক ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে গ্রাম পিছিয়ে থাকবে। গ্রামে পারিবারিক সঞ্চয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

অর্থের প্রতি মনোভাব ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ভিন্নতর হয়ে থাকে। কোনো কোনো পরিবারে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। আবার যে আয় হোক না কেন, সামান্যতম অংশ হলেও সঞ্চয়ের প্রবণতা থাকে এমন পরিবারও আছে। সঞ্চয়কে পারিবারিক সম্পদের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রামের মানুষ গৃহস্থালি কাজ, আবাদ ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। সঞ্চয়ের মাধ্যমে গ্রামের পরিবারগুলো সরাসরি লাভবান হয়। জরুরি প্রয়োজনে এ অর্থ ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত সুদ দিয়ে স্থানীয় দাদনদারদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ থেকে নিস্তার পেতে সহায়ক হয়। পারিবারিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে পুঁজির উৎস তৈরি হয়। গ্রামীণ উন্নয়নে সহায়তার জন্য সঞ্চয় অপরিহার্য। পারিবারিক সঞ্চয় বিনিয়োগ, ঋণপ্রাপ্তি, কৃষি উপকরণ সংগ্রহ, কলকারখানা স্থাপন ও শিল্প উন্নয়নে সহায়তা করে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পারিবারিক সঞ্চয় জমা হলে ঋণ প্রদানে ব্যবহার হয়। এ অর্থ বিনিয়োগে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রসারিত হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আর্থিক বাজারে পারিবারিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ভূমিকা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পুঁজি বা মূলধনের প্রয়োজন হয়, যেমন অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রযুক্তি, কলকারখানা, ব্যবসা প্রসার ইত্যাদির জন্য। অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে দেশের সার্বিক দেনার ভার কমাতে পারিবারিক সঞ্চয় ব্যবহার করা হয়। জাতীয় সঞ্চয় বিনিয়োগে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এগিয়ে যেতে থাকে। পারিবারিকভাবে এ সঞ্চিত অর্থ এক পর্যায়ে জাতীয় সঞ্চয় হিসেবে গড়ে ওঠে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

পারিবারিক সঞ্চয় নির্ভর করে উপার্জন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যস্ফীতি, পেশা, সচেতনতা ইত্যাদির ওপর। শহর থেকে গ্রামে এসব বিষয়ের প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়। এগুলোর ভিত্তিতে গ্রামে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রবণতা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। চলতি দশকে খাদ্য বাবদ ব্যয় কমেছে। গ্রামে ২০১০ সালের তুলনায় কমেছে ১৪ শতাংশ এবং শহরে কমেছে ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। পরিবার প্রতি সদস্য সংখ্যাও কমছে। কৃষি ও কৃষিবহির্ভূত কার্যক্রম বহুমুখী হয়েছে। গ্রামে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি বেশি হয়েছে। পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বৃদ্ধির হার বেশি। এতে পরিবারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব পরিবর্তন গ্রামে পারিবারিক সঞ্চয় বৃদ্ধির অনুকূল হবে। গ্রামেই দেশের মোট জনগোষ্ঠী ও পরিবারের অধিকাংশের বসবাস। সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য গ্রামীণ পরিবারের আয় ও সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। গ্রামে পারিবারিক সঞ্চয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর সঠিক বিনিয়োগ ও লাভজনক করতে প্রয়োজন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ব্যবহার। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এ সহায়তা জোরদারে যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজন।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯