ওরা এগোচ্ছে এগোতে দিন

ওরা এগোচ্ছে এগোতে দিন

মোহাম্মদ নজাবত আলী: বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। এ অধিক জনসংখ্যার দেশে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে বাল্য বিয়ে অন্যতম। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে বড় বাধা। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। দেশে বাল্যবিয়ে নিরোধ (২০১৬) আইন রয়েছে। তবুও বাল্যবিয়ে বন্ধ হচ্ছেনা। কিন্তু নারীরা যেভাবে শিক্ষায় এগিয়ে তাদের এ অগ্রযাত্রাকে এগোতে দেওয়া উচিত। কারণ তারা এগিয়ে যাক সামনের দিকে এবং শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। এক্ষেত্রে সমাজের সকল শ্রেণি এবং পেশার মানুষকে সচেতন হতে হবে। ওরা এগোচ্ছে এগোতে দিন।

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাল্য বিয়ে একটি গুরুতর সমস্যা। এসমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন করেন। বাল্য বিয়ে শুধু আমাদের সমাজে নতুন নয় যুগের পর যুগ ধরে এ অভিশাপ চলে এসেছে। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ রহিত করে নতুন বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সাবালক নাগরিকের বিয়ের করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এখন কতবছর বয়স হলে একজন পুরুষ সাবালক বলে গণ্য হবে। আইন অনুযায়ী তাদের বয়স পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ এবং নারীর জন্য ১৮বছর। এটাই আইনগত বিবাহের বয়স। এর কম বয়সে বিয়ে হলে তা আইনের আওতায় পড়ে না এবং তা বাল্য বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে। আবার ১৯২৯সালের আইনেও মেয়েদের বয়স ১৮ছিল। বাল্য বিয়ে নিরোধ আইন মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ রাখলেও ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশে এবং মা বাবার সম্মতিতে যে কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে হতে পারবে।

 তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮এর নিচে কত বছর বয়সে বিয়ে হতে পারে তা আইনে নির্দিষ্ট করে বলা নেই। সরকার বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬তে একটি লাইন সংযোজন করেছে। বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে ১৬বছর বয়সে বিয়ে। এ আইনটি আগামী ৫বছরের জন্য সরকার বহাল ,রাখতে চান। যদি, তবে, কিন্তু, বিশেষ ক্ষেত্রে, শর্ত সাপেক্ষে কোনোভাবেই মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর করা ঠিক না। সবার মনে রাখা উচিত যেখানে শর্ত থাকে তা ভঙ্গের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে এ শব্দই বাল্য বিয়েকে উৎসাহিত করবে। তাই শর্তহীনভাবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮বছর রাখা যুক্তিসঙ্গত। কারণ ১৬ বছরে বিয়ে হলে এ বয়সে একজন নারী কিভাবে সংসার চালাবে শারীরিক, মানসিক দিক থেকে ভেঙ্গে পড়বে এবং অল্প বয়সে সন্তান হলে মা ও শিশু উভয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। উপরোন্ত নানা সমস্যা দেখা দিবে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানসিক ও সংসার জীবনে অশান্তি। এ মানসিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত সংসার  ভেঙ্গে যাওয়ার পর্যায়েও যেতে পারে।

বর্তমানে সারা দেশে কন্যা শিশুর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও সামাজিক সচেতনতা বাড়েনি। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। যার কারণে অন্ধ কুসংস্কার, অসচেতনতা, অশিক্ষা, প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে ছেলে শিশুদের তুলনায় কন্যা শিশুরা নানা দিক থেকে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। উপরোন্ত বাল্য নিয়ে আমাদের শিশুদের সুরক্ষা একটি বড় বাধা। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সরকার ইতিমধ্যে মেয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮বছর ও ছেলের ২১বছর ঠিক রেখেই বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন তৈরি করেছে সরকার। প্রতিটি সরকারই নতুন প্রজন্ম ও অনাগত শিশুর সুরক্ষার জন্য এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে কতগুলো নীতি আদর্শ গ্রহণ করেন। বাল্য বিয়ে রোধে আইনের এক জায়গায় একটু ফাঁক রাখা হয়েছে যা বাল্য বিয়ে উৎসাহিত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশেষ ক্ষেত্রে’ ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ আদালতের নির্দেশে এবং মা বাবার সম্মতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে হতে পারবে। এ হতে পারাকে ইস্যু করে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে ১৮বছরের আগেই বিয়ে দেয়ার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। ২০১৬ সালে এ আইনটি যখন করা হয় তখন সমাজের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ, মানবাধিকারকর্মী, জাতীয় মহিলা আইনজীবীসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক নারীবাদী সংগঠন শর্তহীনভাবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর করার যুক্তি দেখালেও সরকার তা আমলে নেয়নি।


আমাদের সমাজে কিছু সমস্যা রয়েছে যা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ সচেতনতা সৃষ্টির দ্বারা অনেকটা রোধ করা সম্ভব। বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সমাজ যদি একটু সচেতন হয় তাহলে এর প্রভাব থেকে এদেশের হাজারও নারী মুক্তিপাবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে তেমন সোচ্চার না হলেও কিন্তু মেয়েরা বসে নেই। আমাদের সমাজে কিছু মেয়ে আছে যারা অসম্ভবকে সম্ভব, অজয়কে জয় করেছে। নিশাদ মজুমদার হিমালয় জয় করেছে। মেয়েরা এখন অনেক সাহসী। নিজের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন সম্ভাবনাকে তারা বিনষ্ট করতে চায় না। তাই ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় অন্ধ অনুকরণ, বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। সাহসী প্রতিবাদী মন নিয়ে বরগনার মেয়ে ফারাজানা যৌতুকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এমনকি নিজের বিয়ের আসরে যৌতুক চাওয়ার অপরাধে বরকে সাথে সাথে তালাক দিয়ে সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অন্যায় অশুভ’র কাছে শুভ ও মুক্ত বুদ্ধির পরাজয় কখনো হয় না। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত বলেই যৌতুক চাওয়া ফারাজানার আত্মসম্মানে বাধছে। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে তালাক দিয়ে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেয়।

 ঠিক একইভাবে বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়েও ভেঙ্গে দেয় গাজীপুরের সাহিদা আক্তার স্বর্ণা। শুধু নিজ এলাকায় বা গ্রামে নয় যেখানে বাল্য বিয়ে সেখানে স্বর্ণার উপস্থিতি। স্বর্ণার স্বপ্ন গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে দেশের অবহেলিত শিশু ও নারীদের পাশে দাঁড়ানো। স্বর্ণা বর্তমানে ‘প্লান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল শিশু সুরক্ষ’ দলের সদস্য। শুধু বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধেই নয় স্বর্ণা শিশুদের মৌলিক অধিকার, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে। স্বর্ণা ইতিমধ্যে শিশু ও নারী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছে। এদিকে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শারমীন আক্তার তার পিতা-মাতার নির্যাতন সহ্য করেও নিজের বাল্য বিবাহ ঠেকিয়ে আলোচনায় আসে এবং এখনও বাল্য বিয়ে ঠেকানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই বলতে হয় নিজের আত্মসম্মান, মর্যাদা অস্তিত্ব রক্ষা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, সম্ভবনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন সাহস, প্রতিবাদী মনোভাব। ফারাজানা স্বর্ণা, শারমীন আমাদের অহঙ্কার, আমাদের গর্ব। এরকম হাজারো ফারাজানা, স্বর্ণা, শারমীন বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াক, জন্মনিক মাতৃজঠে।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সে ৫শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৯বছর বয়সের দুই তৃতীয়াংশ কিশোরীর বিয়ে হয়। সেভ দ্যা চ্রিলড্রেন এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৬৯শতাংশ নারীর ১৮’র আগেই বিয়ে দেয়ার কারণে তারা নানা বৈষম্য ও নির্যাতনের কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের ৬৮শতাংশ কন্যা শিশু বিয়ের শিকার এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ পরবর্তী সময়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ মেয়েই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা স্বামী সংসার কাজে নিয়োজিত থেকে এক সময় তারা শিশু মায়ে পরিণত হয়। এমনকি তারা অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। অথবা স্বাস্থ্যহীন, অস্বাস্থ্য, পুষ্টিহীন আরেক শিশুর জন্ম দেয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ কন্যা শিশুর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগেই।

তাই যে কোনোভাবেই বাল্যবিয়ে রোধ করতে হবে। স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষক, সাংবাদিক, স্থানীয় প্রশাসনের হস্থক্ষেপে বাল্য বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনা আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখতে পাই। এমনকি বর কনের অভিভাবককেও জেল জরিমানা দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। তাই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের পাশাপাশি সবাইকে বাল্য বিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। সরকারও চাচ্ছে বাল্য বিয়ে বন্ধ হোক, এজন্য আইনও করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে বাল্য বিয়ে হতে পারে আইনের এ ১৯নম্বর ধারা বাল্য বিয়ে রোধ করবে কিভাবে ? তাই বাল্য বিয়ে নিরোধ আইনে বয়সের দিক থেকে কোনো শর্তারোপ করা ঠিক হয়নি।  শর্তহীনভাবে ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স ২১-১৮ করা উ”িত ছিল। পাশাপাশি আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা, সামাজিকভাবে গণসচেতনতার মাধ্যমে বাল্য বিয়ে রোধ করতে হবে। কারণ আমরা শিশুর পেটে শিশু  দেখতে চাইনা।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১