ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন

ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ : ‘নির্বাচন’ শব্দটিকে আরবিতে ‘আল ইন্তিখাব’ ইংরেজিতে ইলেকশন বলা হয়। আল্লাহর রাসুল (সা) ইন্তেকাল করার পর সাহাবীগণ রাসুলের কাফন দাফন না করে প্রথম খলিফা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ৬৩২ ঈসায়ী ৭ জুন সোমবার দুপুরে ইন্তেকালের পর হতে সারা দিন সারা রাত অতিবাহিত হওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে কণ্ঠভোটে আবু বকর (রা:) এর খিলাফতের ব্যাপারে সবাই একমত হন। তখনো নবী করিম (সা) এর পবিত্র দেহ একখানা ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে আবৃত ছিল। প্রথম খলিফা নির্বাচনের পর মঙ্গলবার নবীজীর গোসল, কাফন, জানাজা শেষ করে দিবাগত রাতের প্রথম ভাগে দাফন করা হয়। অনুরূপভাবে পরবর্তী খলিফাদের ইন্তিকালের পরও এ নীতিই অবলম্বন করা হয়েছে। এ জন্য আল্লামা তাফতাযানী (রহ) নির্বাচন ওয়াজিব বলেছেন। নির্বাচন মুসলমানদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য বলা হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রের প্রধানকে খলিফা, আমীর, ইমাম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে বা উপাধিতে ভূষিত করা হতো। ইসলামি রাষ্ট্র বিজ্ঞানে দেশের নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃত। এ অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা যাবে না। জনগণের মতামত না নিয়ে রাষ্ট্রীয় পদ দখল করা বৈধ নয়। উপরোক্ত অধিকারের ক্ষেত্রে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই সমান। ‘‘ন্যায় বিচারক ইমাম বা রাষ্ট্র প্রধান ক্বিয়ামতে মহান আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন।
 
প্রাক ইসলামি যুগে নির্বাচন বিষয়ে জনগণের মতামত নেয়া হতো না। ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচনের পদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের হলেও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে বা পরামর্শের ভিত্তিতে তা সুসম্পন্ন হতে হবে। আধুনিক বিশ্বে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হলো ভোট। ভোটের মাধ্যমে ভোটার নির্বাচন বিষয়ে তাঁর মতামত ব্যক্ত করবেন। পবিত্র কুরআনে ভোটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ২টি শূরায় ৩টি আয়াতে তিন ধরনের শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। ১নং সর্বজন কথা হলো ভোট একটি ‘আমানত’। আমানত আরবি শব্দ। এখন বাংলা ভাষাতেও আমানত শব্দের  ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর অর্থ হলো ‘গচ্ছিত’। ‘আমানত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। বান্দার উপর আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের নাম আমানত। আবার মানুষের নিকট মানুষের প্রাপ্য হক। যেমন- একজন অন্য জনের নিকট কোন দ্রব্য বা অর্থ কিংবা কোন গোপনীয় কথা রাখা বা বলাকেও আমানত বলা হয়। আমানত খিয়ানত করা কঠিন পাপ। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেক নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন আমানত তার অধিকারীকে বুঝে দাও।’’ সুরা নিসা আয়াত নং- ৫৮। আয়াতটি যে উদ্দেশ্যে নাজিল হোক না কেন আয়াতে বর্ণিত নির্দেশ সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। ২নং আমানতের মতই আরেকটি শব্দ আছে। সেটা হলো ‘শাফায়াত’ অর্থাৎ সুপারিশ। শাফায়াতের শাব্দিক অর্থ হলো মিলিত করা’। আরবিতে শুফআ অর্থাৎ জোড় বা জোড়া বলা হয়। অতএব ‘শাফায়াত’ বলতে কোন দুর্বলকে স্বীয় শক্তি যুক্ত করা। সুপারিশ ২ প্রকার ভাল ও মন্দ।

ভাল ব্যক্তির ভাল বিষয়ে সুপারিশ করা পূণ্যের কাজ। মন্দকে সুপারিশ করা মন্দ কাজ বা পাপ কাজ। সুপারিশের বিনিময় গ্রহণ অপরাধ। কোন মুসলমানের অভাব, দুঃখ কষ্ট দুর করার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করাও সুপারিশ। (মাযহারী)। মহান আল্লাহ বলেন ‘‘যে ভালোর জন্য সুপারিশ করবে উহাতে তার অংশ থাকবে। (অর্থাৎ সাওয়াব পাবে)। আর যে মন্দের জন্য সুপারিশ করবে উহাতেও তার অংশ থাকবে। (অর্থাৎ অপরাধ হবে)। বস্তুুত: আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।’’ সুরা নিসা আয়াত নং-৮৫। ৩নং শাফায়াতের মতই আরেকটি শব্দ পবিত্র আল কুরআনের সুরা মায়েদার ৮নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলো ‘শাহাদত’। ইরশাদ হচ্ছে ‘‘হে মুমিনগণ তোমরা উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে’’। তাফসীরে উক্ত ‘সাক্ষ্যদান’ শুধু মামলার সাক্ষ্য হিসাবে বলা হয়নি বরং যে কোন বিষয়ে সাক্ষ্য পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সাক্ষ্য বিভিন্ন প্রকার সনদ প্রতারণা নির্বাচনের ভোট দান সবই সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। আরও ব্যাপকভাবে বলতে গিয়ে বলা যায় যে, চিকিৎসক রোগ সম্পর্কে রিপোর্ট দেন এটাও সাক্ষ্য।

এইভাবে কোন কমিটি, গভর্নিং বডি, চেয়ারম্যান এমপি ইত্যাদির নির্বাচনে ভোট দেওয়াও এক প্রকার সাক্ষ্য দান। এতে ভোটার তার ভোট দিয়ে সাক্ষ্য দেন যে, আমার মতে এ ব্যক্তি প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য। এমনিভাবে যে কোন প্রকার পরীক্ষায় রেজাল্ট ও এক প্রকার সাক্ষ্য বা সুপারিশ। তিনটি আয়াতে আমানত, শাফায়াত, শাহাদত শব্দগুলোতে পরোক্ষভাবে ভোট বা নির্বাচনের বিষয়টিও বুঝান হয়েছে। এ জন্য শুরা মায়েদার ৮নং আয়াতে তাফসীরে ভোটের তিনটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে এক সাক্ষ্যদান, দুই সুপারিশ, তিন সম্মিলিত অধিকার এ জন্য ওলামায়ে কেরাম সততার সাথে বিনিময় ছাড়া যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়া মুসলমান হিসাবে কর্তব্য বলেছেন। দেখুন তাফসীরে মারিফুল কুরআন (সংক্ষিপ্ত) পাতা নং-৩১৩-৩১৫ পাতা। আমাদের জানা উচিত যে, ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মানবতার কল্যাণের জন্যই নবী রাসুলের আগমন। মহান আল্লাহ চান যে, পৃথিবীতে সকল মানুষ শান্তিতে বসবাস করুক। সকল ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য কর্তব্য। একমাত্র ইসলাম ধর্মেই বিশ্বাস থেকে শুরু করে ইবাদাত, লেনদেন, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনীতি, দাওয়াত এরশাদ বিচার আইন-আদালত সকল বিষয়ে দিক-নির্দেশনা রয়েছে। ডেভিড আর্ক হার্ড যথার্থই বলেছেন, ‘‘ইসলাম মানুষের জন্য কোন নতুন মতাদর্শ শিক্ষা দেয় না। ইসলাম মানুষের জন্য পেশ করে ধর্ম সমর্থিত একটি সংবিধান, রাষ্ট্রের জন্য একটি শাসনতন্ত্র’’। ইনশাল্লাহ এ মাসের ৩০ তারিখে রবিবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হোক এটাই সকলের প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ আমাদেক রহম করুন। আমীন।
লেখক ঃ খতিব, উপশহর মসজিদ
মুহাদ্দিস, উম্মুল কুরান কওমি মাদ্রাসা, বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮