আখেরী চাহার শোম্বার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

আখেরী চাহার শোম্বার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসেইন : আখেরী চাহার শোম্বা কি এবং কেন? এ সম্পর্কে জানার ইচ্ছা অনেকেরই রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও এর মূল তথ্য বা ঘটনা সম্পর্কে অনেকের ধারণা নেই। আখেরী চাহার শোম্বা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর প্রেমিক উম্মতদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এদিনের মর্যাদা ও দর্শন অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী। তাই জ্ঞানী পাঠক সমাজের নিকট এ বিষয়ের তথ্য নির্ভর কিছু আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী কুল মাখলুকাতের জন্য যিনি ছিলেন রহমত ও কল্যাণ সেই মহামানব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) কে ভালবাসা বা তাকে মহব্বত করা প্রতিটি মোমিন বান্দার জন্য অবশ্য কর্তব্য। কারণ মহান আল্লাহ সোবহানু তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন (হে নবী)’ বলুন তাদের কে যারা আল্লাহকে ভালবাসতে চায় তারা যেন মুহাম্মদ (সাঃ) কে ভালবাসে। (আল কোরআন)

অন্যত্র মহানবী (সাঃ) বলেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি প্রকৃত মোমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত যে তার জীবন, পিতামাতা, সন্তান-সন্ততী, নিকট আত্মীয় তথা সমস্ত মানুষ অপেক্ষা আমাকে (মোহাম্মদ সা:) বেশী ভাল না বাসবে। (বোখারী ও মুসলিম।) কোরআনের বাণী ও হাদীস থেকে জানা যায় আল্লাহকে পেতে হলে এবং প্রকৃত মোমিন মুত্তাকি হতে হলে মহানবী (সাঃ) কে মহাব্বত করতে হবে। মহাব্বত তথা ভালবাসা অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে তাকে অনুসরণ করা বা তার নির্দেশিত পথে চলা। তার কথামত জীবন পরিচালিত করা। মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- কে ভালবাসার কারণেই আজও বিশ্বের মুসলিম সমাজ তার জন্ম ও ওফাৎ দিবস আসলেই সর্বত্র দোয়া, যিকির, দরুদ, মিলাত মাহফিল, ইছালে সওয়াব সহ নানা মুখী ধর্মীয় কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। মহানবী (সাঃ) এর ওফাত দিবসের ন্যায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস হচ্ছে আখেরী চাহার শোম্বা। যা হচ্ছে পবিত্র সফর মাসের শেষ বুধবার। অর্থাৎ পবিত্র সফর মাসের শেষ বুধবার কেই বলা হয় আখেরী চাহার শোম্বা। যা ফার্সি শব্দমালা থেকে নেয়া হয়েছে।
 
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইন্তেকালের পূর্বাভাসই হচ্ছে আখেরী চাহার শোম্বা। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) ইন্তেকালের প্রায় ৬মাস পূর্ব থেকে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এই আভাস পেতে লাগলেন, ওয়ালাল আখিরাতু খাইরুল লাকা মিনাল উলা, (আল-কোরআন), অর্থ “হে হাবিব! আপনার জন্য ইহকাল অপেক্ষা পরকাল অতি উত্তম।” হযরত ফাতেমা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাকে একদিন বললেন, হে ফাতেমা! জিব্রাইল প্রতি বছর একদিন একবার আমার কাছে কোরআন মাজীদ পেশ করতেন, কিন্তু এবছর দু’বার পেশ করেছেন, বোখারী শরীফ। এরপর থেকেই মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহাপ্রস্থানের প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রতি বছর তিনি ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। ১০ম হিজরিতে তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দেড় বছর বয়স্ক পুত্র হজরত ইব্রাহীম ইন্তেকাল করেন। এতে রাসুলের (সা.) দুচোখে অশ্র“ ঝর ঝর করে ঝরছিল, ঠিক এই সময় কে যেন তাঁর কানে পরকালের সুর শুনিয়ে দিলেন। ইহজগত থেকে বিদায় গ্রহণের পূর্বে বিশ্ব নবী (সা.) শেষবারের মত ক্বাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ২৩ শে জানুয়ারি মোতাবেক ২৫ শে জিলক্বদ ১০ম হিজরী বিশ্বনবী অসংখ্য সাহাবী এবং  তাঁর স্ত্রীদেরকে নিয়ে হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফের পথে যাত্রা শুরু করেন। ৭ই মার্চ ৫ই জিলহজ্ব ক্বাবা শরীফ পৌছে ক্বাবা শরীফ তাওয়াফ করেন। সাফা-মারওয়া সাঈ করেন। ৯ই জিলহজ্ব বাদ ফজর আরাফাতের ময়দানে হাজির হয়ে দিনের শেষ প্রান্তে বিকালবেলা জাবালে রহমতের নীচে আজবা নাম উঠের পিঠে বসে বিশ্ব মুসলিম জাতির উদ্দেশে উদাত্ত কণ্ঠে তাঁর জীবনের সর্বশেষ বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ দেন। ১০ম হিজরি সনে মহানবী (সা.) হজ্ব পালন করে মদিনা শরীফ ফিরে এসে ব্যাকুলতার মাঝে কর্মব্যস্ততায় থাকতেন। হজ্ব ও ওমরাকারিদের জিয়ারার সময় এই জাবালে রহমত ঘুরে ফিরে দেখানো হয়। মহানবী (স.) যেখানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই উচু জায়গাটি সৌদি সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দিক (রা.) বলেন, একদা রাসুল (সা.) জনৈক সাহাবীর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। জানাজা থেকে ফিরার পথে তার ভীষণ মাথাব্যথা শুরু হয়। তিনি বাড়িতে এসে দেখেন, আমি মাথার পীড়ায় ভীষণ ছটফট করছি। আমি ব্যথায় অস্থির হয়ে বললাম, মাথা গেল! মাথা গেল! অসহ্য ব্যথা, তা শুনে রাসুল (সা.) বললেন ‘হে আয়েশা তোমার মাথা ব্যথার কথা কি বলছ? উত্তরে: আয়েশা বললেন, আমার মাথা গেল, প্রচন্ড ব্যথা! তৎপর তিনি মৃদু হেসে চিকন সুরে বললেন, হে আয়েশা, আমার পূর্বে যদি তোমার মৃত্যু হয়, তবে কি তুমি সুখী হবে না? আমি নিজ হাতে তোমাকে গোসল দিয়ে, কাফন পরায়ে, জানাজা দিয়ে কবের শোয়ায়ে দিব.......। ক্রমে ক্রমে রাসুল (সা.) এর পীড়া বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি সব বিবিদের অনুমতি ক্রমে আয়েশা (রা.) এর হুজরায় অবস্থান করেন। (বোখারী শরীফ)। রাসুল (সা.) অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে যেতে অক্ষম ছিলেন, ততদিন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নামাজের ইমামতি করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় নবী (সা.) পরিবার ও সাহাবাদের মনে ভীষণ কষ্ট ও হতাশা বিরাজ করতে থাকে।  

হঠাৎ সফর মাসের শেষে বুধবার ২৯ তারিখ সকাল বেলা রাসূল (সা.) সম্পূর্ণ সুস্থতা লাভ করেন। তিনি অজু গোসল করেন, এ গোসলই ছিল তাঁর জীবনের শেষ গোসল। গোসল শেষে তিনি খাওয়া দাওয়া করে জোহরের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে আগমন করেন। তাঁর শুভাগমন ও সুস্থতার অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কেরামগণ (রা.) মহা আনন্দে আনন্দিত। এ খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র মদিনার ঘরে ঘরে, অলিতে গলিতে আনাচে কানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অল্প কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সাহাবা (রা.) রাসুল (সা.) এর সুস্থতার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করতে থাকেন। মেশকাতুল আনোয়ার গ্রন্থে বর্ণিত আছে রাসূল (সা) এর সুস্থতায় খুশি হয়ে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সাত হাজার দিনার ওমর ফারুক (রা.) পাঁচ হাজার, হযরত ওসমান (রা.) দশ হাজার দিনার, হযরত আলী (রা.) তিন হাজার দিনার, হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) একশত উট ও একশত ঘোড়া আল্লাহর রাস্তায় গরীব মিসকিন ও অসহায়দের মাঝে বিতরণ করে। এছাড়া অন্যন্য সাহাবীরা যার কাছে যা কিছু নগদ অর্থ সম্পদ ছিল তা সাধ্যমত আল্লাহ রাস্তায় গরিব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করতে থাকেন। নামাজের সময় হলে রাসূল (সা.) নামাজ পড়ালেন, নামাজ শেষে রাসূল (সা.) মিম্বারে আসন গ্রহণ করে তার জীবনের সর্বশেষ ভাষণ ও উপদেশ বাণী পেশ করেন। এ ভাষণে তিনি বললেন, মহান আল্লাহতায়ালা তার এক বান্দাকে এই ক্ষমতা প্রদান করেছেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে পার্থিব নেয়ামত ভোগ করতে পারেন, আর ইচ্ছা করলে আল্লাহর কাছে গমন করে পারলৌকিক নেয়ামত ভোগ করতে পারেন। কিন্তু আল্লাহতায়ালার সেই বান্দা আল্লাহর কাছে গমন করে পারলৌকিক নেয়ামত ভোগ করাকে পছন্দ করেছেন।

ওই কথাগুলো শুনে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কান্না শুরু করেছেন। অতঃপর রাসূল (সা) আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কে সান্ত¡না ও প্রবোধ দেয়ার লক্ষ্যে বললেন, যার সৎসর্গ ও অর্থ সম্পদ দ্বারা আমি সর্বাধিক উপকৃত হয়েছি, তিনি হলেন আবু বকর। আমি যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহাকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম। অতঃপর তিনি বললেন, মসজিদের দিকে সব বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়া হউক, কেবলমাত্র আবু বকরের দরজা ব্যতীত। এভাবে তিনি ভাষণ শেষ করে হজরত আয়েশা সিদ্দিক (রা.) এর হুজরায় তাশরিফ আনার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় একদিন তার প্রিয় কন্যা ফাতেমাকে ডেকে এনে কানে কানে কী যেন বললেন, এতে মা ফাতেমা কেঁদে ফেললেন, আবার ডেকে এনে কানে কানে কী যেন বললেন, এতে মা ফাতেমা হেসে উঠলেন।
 
পিতা-কন্যার কথাবার্তা হাসি-কান্না শেষে হজরত জিব্রাইল (আঃ) অসংখ্য ফেরেস্তার বহর এবং হজরত আজরাইল (আঃ) নিয়ে রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যু শয্যায় হাজির হন। জিব্রাইল (আ.) রাসূল (সা.) কে সালাম জানিয়ে বললেন, হুজুর আল্লাহ তায়ালা আপনার মোলাকাতের আশা করছেন, আর ইনি হলেন সব সৃষ্ট জীবের প্রাণ হরণকারী আজরাইল (আ.)। সে আপনার অনুমতির অপেক্ষা করছে। রাসূল (সা.) বললেন, এখন আর কিছুই চাইনা, শুধু পরম বন্ধু আল্লাহ তায়ালার মিলন চাই। এ বলেই তিনি আজরাইল (আ.) কে ইঙ্গিত করলে জিব্রাইল এর আদেশে রাসুল (সা.) এর পবিত্র আত্মা মোবারক দেহ মোবারক থেকে বাহির করে আল্লাহতায়ালার দরবারে হাজির করা হয়। এভাবে বিশ্ব মানবের সর্বশ্রেষ্ঠ রহমতের কর্ণধার হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আত্মা মোবারক আল্লাহতায়ালার পবিত্র শাহী দরবারে চলে যান। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বোখারী শরীফ।

একদিন যাকে পেয়ে সারা বিশ্বজগত আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল। আজ তাকে হারিয়ে সেই বিশ্বজগত সব আনন্দ উল্লাস বিষাদে পরিণত হলো। বিশ্বধরণীর মর্মভেদী আর্তনাদে আকাশ বাতাস উতলা হয়ে উঠল। রাসূল (সা) এর ইন্তেকালে সারা পৃথিবী যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়লো। সেই থেকে বিশ্বের সব মুসলিম জাতি, বিশেষ করে রাসূল (সা.) এর প্রেমিক ভক্তগণ আখেরী চাহার শোম্বা ও তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিবস ১২ রবিউল আওয়াল অধিক আগ্রহের সাথে অদ্যাবধি পালন করে আসছেন। এজন্য আজাকের এই বরকতময় দিনে আমাদের উচিত রাসুল (রা.) এর প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ, জিকির আসকার এবং সাধ্যমত দান খয়রাত করা। আল্লাহ আমাদের সহায় হন।
লেখক : কলামিস্ট-ইসলামী গবেষক  
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮