শর্তের বেড়াজালে ঘুরপাক বিএনপির জাতীয় ঐক্য

 শর্তের বেড়াজালে ঘুরপাক বিএনপির জাতীয় ঐক্য

রাজকুমার নন্দী : গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখে বিএনপির সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ঐক্য প্রক্রিয়ায় আগ্রহী দলগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে বিএনপির কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। জানা গেছে, এসব বৈঠকের পর জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনও ঐক্য প্রক্রিয়ায় শামিল হতে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। তবে ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করাসহ তিনটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন তিনি। এছাড়া শর্তসাপেক্ষে বিকল্পধারাও ঐক্যে শামিল হতে রাজি। তবে বিএনপির হাইকমান্ড জাতীয় ঐক্য নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী দলগুলোর সাথে আরও আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের দাবি- পরিবর্তন, উন্নয়ন ও সুশাসনের দাবিকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্য হওয়া উচিত।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় দন্ডিত হয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার আগে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সরকারবিরোধী বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন খালেদা জিয়া। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করে খালেদা জিয়াকে নিয়েই আগামী নির্বাচনে যেতে চায় বিএনপি। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের বাইরে থাকা কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে এই ঐক্য গঠনের উদ্যোগ চলমান থাকলেও তা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোতে সময় নিচ্ছে। কারণ, আগ্রহী দলগুলোর নেতারা দর-কষাকষি করছেন বিএনপির সঙ্গে। তারা জামায়াতের সঙ্গ ছাড়াসহ আসন বন্টনের সুরাহা কিভাবে হবে, পার্লামেন্ট বা কেবিনেটে কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হবে- সেসব বিষয়ে আগেই ফয়সালা চান। এই ঐক্য প্রক্রিয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিএনপি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আসম আবদুর রবের জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য। এছাড়া বেশ কয়েকটি বাম দল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও একই ছাতার নিচে আনতে চান সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসম আবদুর রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য বিএনপির ঐক্য প্রক্রিয়ায় সাড়া দিলেও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এখনো দোদুল্যমান। বঙ্গবীরের পক্ষ থেকে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার সুস্পষ্ট শর্ত দেয়া হয়েছে। বি. চৌধুরীর পক্ষ থেকেও কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। সেখানে বিএনপিকে যুক্তফ্রন্টের শরিকদের জন্য বড় ধরনের আসন ছাড় দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ঐক্য প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দলের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকের পর সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্যে শামিল হতে সায় দেন ড. কামাল। তবে এ ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত জুড়ে দেন তিনি।

সূত্র মতে, গণফোরামের প্রথম শর্ত হলোÑ জাতীয় ঐক্য করতে হলে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আদালত থেকে স্বীকৃত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। জামায়াত থাকলে ড. কামাল হোসেন সেই ঐক্যে থাকবেন না। দ্বিতীয় শর্ত-জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্ম থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানানো যাবে না। তবে বিএনপি তাদের দল বা জোট থেকে বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার থাকতে পারবে, প্রয়োজনে আইনি লড়াইও অব্যাহত রাখতে পারবে। তৃতীয় শর্ত-জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্ম থেকে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া যাবে না। তবে বিএনপি চাইলে দল বা ২০ দলীয় জোটগতভাবে তারেক রহমানের প্রসঙ্গটি সামনে আনতে পারবে। কিন্তু এর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যমঞ্চের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এসব শর্তের পাশাপাশি কোন কোন ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে জোট হতে পারে বৈঠকে সে বিষয়টিও পরিষ্কার করেন ড. কামাল হোসেন। এর অংশ হিসেবে গণফোরামের পক্ষ থেকে সাত দফা লিখিত প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে।

জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী গত রোববার দৈনিক করতোয়াকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমরা (গণফোরাম) প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কোনোভাবেই জোট করব না। বিষয়টি বিএনপিকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা ও চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে চাই। এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় আমরা জামায়াতের বাইরে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সবাইকে স্বাগত জানাবো। আমরা একটি অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। সেখানে যে পরিবর্তনটা হবে-সেটা শুভ পরিবর্তন। বিএনপিকে শর্ত দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে জাতীয় ঐক্য হতে গেলে মিনিমাম এই বিষয়গুলো লাগবে। তবে এটা বেশি বেশি প্রচার হচ্ছে যেÑ আমরা শুধু বিএনপিকে শর্ত দিচ্ছি।

 জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় আমরা আওয়ামী লীগকেও আহ্বান জানাবো। তাদের সাথেও আমাদের শর্ত থাকবে- গণতন্ত্র দেন, সুশাসন দেন, নিরপেক্ষ প্রশাসন দেন, সংবিধান মোতাবেক দেশ চলুক, শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো মেনে নেন। তবে কোনো দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমঞ্চের প্লাটফর্ম ব্যবহার করা যাবে না। গণফোরামের শর্তের ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদেরকে এখনো কিছু জানানো হয়নি বলে জানান সুব্রত চৌধুরী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনের দাবি ও প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগ্রহী দলগুলোর সাথে আরও আলোচনা করা হবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে সর্বশেষ পরিস্থিতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করে তার নির্দেশনায় ওইসব দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। জাতীয় ঐক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশের মানুষ শুভ পরিবর্তন চায়। সুতরাং পরিবর্তন-উন্নয়ন-সুবিচার ও সুশাসনের দাবিতে সবাইকে মিলিতভাবে জাতীয় ঐক্যে শামিল হতে হবে। এখানে অন্য কোনো বিষয় টেনে এনে বিতর্ক বাড়ানো ঠিক হবে না।

যুক্তফ্রন্টে যুক্ত হলেন কামাল হোসেন : ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তফ্রন্ট। গত রোববার রাতে বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নানের গুলশানের বাসভবনে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর প্রেস সচিব জাহাঙ্গীর আলম এই তথ্য জানিয়েছেন। যুক্তফ্রন্টে বর্তমানে বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য রয়েছে। বৈঠকে এই তিন দলের নেতাদের সঙ্গে গণফোরামের নেতারা ছাড়াও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।