রাজনৈতিক সংকীর্ণতাই প্রধান অন্তরায়

 রাজনৈতিক সংকীর্ণতাই প্রধান অন্তরায়

রায়হান আহমেদ তপাদার : বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রের উন্মেষ ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অতীত ইতিহাসে বিভিন্ন কারণে জাতি রাষ্ট্রভিত্তিক ভৌগোলিক ঠিকানায় কট্টর অবস্থান বজায় রাখার মনমানসিকতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সর্বশেষ সার্ক সম্মেলন থেকে উপমহাদেশে জড়ো হয়ে থাকা অন্ধকারের ঘনঘটা ভেদ করে আশার বর্ণিল আলোক রশ্মি পরিদৃষ্ট হচ্ছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলা, অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার ও বিশেষায়িত জ্ঞানের আদান-প্রদানের অংগীকার দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত হয়েছে। তাছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিমিত্তে বিভিন্ন সম্ভাবনা কাজে লাগাবার আগ্রহ পূর্বের চেয়ে আরও প্রগাঢ়ভাবে অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে পরস্পর সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দরকার রয়েছে সে উপলব্ধি অত্র দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ সম্ভবত প্রথমবারের মত সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়সমূহের পরিবর্তে উপমহাদেশের ভূপ্রকৃতি ও অর্থনৈতিক বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে তাকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে রাষ্ট্রীক সীমারেখাকে প্রাথমিকভাবে সমন্বিত ও দ্রুত আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে উদার ও মুক্ত মনে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করলে রাষ্ট্রীক সীমরেখা আঞ্চলিক সমন্বিত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। প্রসঙ্গত বলা যায়, উক্ত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে না পারলে উপমহাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা সম্ভবত স্বপ্নের জগতেই থেকে যাবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতা বিকাশে ভারতীয় পন্ডিতরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। হাজার বছর আগে দক্ষিণের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের আমলে নৌবাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌবাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট তাতে দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিশর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার, আবার অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা হয়ে সুমাত্রা, জাভা (মল্লিকা প্রণালি), হংকং, জাপান পর্যন্ত ভারতীয় বাণিজ্য রুট সম্প্রসারিত ছিল। মোদি সরকার এ ‘কটন রুট’কেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রাচীনকালে ভারতীয় তুলা তথা সুতি এ সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। একদিকে চীনা নেতা শি জিন পিং তার ‘সিল্ক রুট’-এর ধারণা নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব যেমন প্রতিষ্ঠা করতে চান, এর প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত তার পুরোনো ‘কটন রুট’-এর ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়েছে সেখানেই। বাণিজ্য নির্ভর এ দ্বন্দ্ব শেষ অবধি পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌবহরে বিমানবাহী জাহাজ আরও বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। ভারত নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করেই বোঝা যায়, নয়াদিল্লির ভয়টা আসলে পাকিস্তানকে নিয়ে নয়, বরং চীনকে নিয়েই। ভারত এখন চুক্তির ফলে নিজেরাই এফ-১৬ বিমান তৈরি করবে। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রও তারা কিনছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এটা তো ঠিক, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘মিত্র’ হিসেবে চাইছে।
 
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সঙ্গে পাশের দেশগুলোর যে বিবাদ, তাতে চীনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়নি ভারত। এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত দোকলামে দুইপক্ষকে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এখানে মেসেজটি স্পষ্ট। ভারত ও চীন কেউ কাউকে ‘ছাড়’ দিতে চায় না। উভয় দেশই দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় সমস্যায় সুবিধা নিতে চায়। এখানে বলতেই হয়, চীনের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী। পাকিস্তানের পর মালদ্বীপে বড় স্বার্থ ছিল চীনের। এখন মালদ্বীপে চীনের স্বার্থ ক্ষুণœ হতে চলেছে। কিন্তু ভারতপন্থি একজন প্রেসিডেন্ট সেখানে দায়িত্ব নিলেও চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, সে ব্যাপারে কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাকে হত্যা করতে চাচ্ছে! এটা একটা গুরুতর অভিযোগ। এর পেছনে সত্যতা যাই থাকুক না কেন, মালদ্বীপে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের ভূমিকা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারত বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই সঙ্গে অনেকটা নীরবে প্রতিরক্ষা বাহিনী আধুনিকীকরণও করে ফেলেছে ভারত। এসব কারণে পাকিস্তানের নয়া সরকার যে এক ধরনের অস্বস্তিতে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট একটি বিরূপ মন্তব্যও করেছেন। পাকিস্তানের নয়া প্রেসিডেন্ট আলফি মন্তব্য করেছেন এভাবে যে, ভারতের ‘আক্রমণাত্মক আচরণ’ দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু দেশ ভারতকে অতিরিক্ত সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। ভারত ফ্রান্সের সঙ্গে রাফাল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পৃথিবীর সেরা যুদ্ধবিমানগুলোর অন্যতম হচ্ছে এ রাফাল।

ভারত রাশিয়া থেকে এস-৪০০ মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করছে। মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানগুলোর আধুনিকীকরণের কাজও সেরে ফেলেছে ভারত। ফলে পাকিস্তান যে এক ধরনের অস্বস্তিতে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। শুধু পাকিস্তান কেন, চীনও ভারতের সামরিক সজ্জাকে ভালো চোখে দেখছে না। সম্প্রতি মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীনাপন্থি হিসেবে পরিচিত ইয়ামিন হেরে গেছেন। এর পেছনে ভারতের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এটা চীনের জন্য একটা সেটব্যাক মালদ্বীপে ভারত ও চীনের স্বার্থ রয়েছে। মালেতে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ভারতের একটি কোম্পানি কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন সে চুক্তিটি বাতিল করে একটি চীনা কোম্পানিকে দিয়েছিলেন। চীন সেখানে বিশাল বিনিয়োগ করছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে চীনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। চীন যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে মালদ্বীপের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ‘মুক্তার মালা’ নীতির মাধ্যমে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে চায়। এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়টি সমুদ্রবন্দর ‘কানেক্টেড’ থাকবে এবং চীন তা তার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, পাকিস্তানের গাওদারে ও শ্রীলঙ্কার হামবানতোতায় চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। এর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা চীনের হাতে। ভারত এ বিষয়টিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলেই মনে করে। হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতির রেশ ধরে শ্রীলঙ্কায় সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত হয়েছিল।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘চীনঘেঁষা’ নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ২০১৬ সালে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি রাজাপাকসে আবারও পাদপ্রদীপের আলোতে এসেছেন। তিনি আগেই সংসদ নির্বাচন দাবি করেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনাকে ভারতঘেঁষা বলে মনে করা হয়। সিরিসেনা শ্রীলঙ্কায় চীনা প্রভাব কমাতে চাচ্ছেন। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ‘সহ্য’ করবেন না। ২০১৫ সালে ভুবনেশ্বর আইওআর সম্মেলনে এ মেসেজটিই তারা দিয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নয়া দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও এ দুটি দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় প্রভাব বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে এ ‘জাফনা কার্ড’ ব্যবহার করা প্রমাণ করে ভারত ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়। ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, ভারত প্রাচীনকালে তার ‘কটন রুট’ ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল।বলা হয়, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা রয়েছে বৈকি! জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে, যা চীনের স্বার্থের বিরোধী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যে নয়া সিল্ক রুটের কথা বলেছেন, তা অন্য চোখে দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এতে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃক প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশ এ ‘সিল্ক রোড’টি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সিল্ক রোড এর মাধ্যমে চীনের পণ্য সুদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য, সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন ‘নিউ সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একই সঙ্গে একটি মেরিটাইম সিল্ক রুটের কথাও আমরা জানি, যা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীন থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতে চীনারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, মালয়েশিয়ায় এসেছিল। পরে তারা স্থায়ী হয়ে যায়, এমন কথাও বলা হয়Ñ ব্রুনাইয়ে ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে চীনাদের অবদান ছিল বেশি। উল্লেখ্য, উপমহাদেশের বিভিন্ন বিষয়াদিতে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও স্বার্থও সম্ভবত ‘একক দক্ষিণ এশিয়া থিসিসের নিমিত্তে কাজ করে যাচ্ছে। নেপালের মাওবাদী গেরিলাদের সরকারের অন্তর্ভুক্ত করে রাজনৈতিক ঐক্য ও অভ্যন্তরীণ বিবাদের মীমাংসা এবং সে সাথে গণতন্ত্রায়নের অগ্রযাত্রা উপমহাদেশের ঐক্যের জন্য সম্ভবত পাথেয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব বিবেচনায় এ সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নোংরা রাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ দক্ষিণ এশিয়াকে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেখে সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই।এমনকি শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশের মাধ্যমে অপরাজনীতি সৃষ্ট পরস্পরের মধ্যেকার বিভেদ ও বিদ্বেষ দূর করতে হবে। এভাবে এগিয়ে গেলে হযতো দু’এক দশকের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারবে।
লেখক : কলামিস্ট

[email protected]