নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ব্যতিক্রমী সাইকেল র‌্যালি

বগুড়ার ৪৯৫ নারী শিক্ষার্থী গড়লো নতুন ইতিহাস

 বগুড়ার ৪৯৫ নারী শিক্ষার্থী গড়লো নতুন ইতিহাস

স্টাফ রিপোর্টার : ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে/আমরা আছি এক সাথে, নারীর কথা শুনবে বিশ্ব/কমলা রঙে নতুন দৃশ্য’-এই শ্লোগানে গতকাল শুক্রবার বগুড়ায় জেলা পুলিশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী ও বর্ণাঢ্য বাইসাইকেল র‌্যালি। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এই র‌্যালিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪শ’৯৫ জন নারী শিক্ষার্থী অংশ নেয় বলে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন। তিনি এটাকে একটা রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইতোপূর্বে যুক্তরাজ্যে আয়োজিত একটি সাইকেল র‌্যালিতে মোট ২২১জন নারী অংশ নিয়েছিল। তিনি বলেন, খৃস্টের জন্মেরও ৪শ’ বছর আগের সভ্যতার ইতিহাস এই বগুড়ার। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মোট ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচশ’জন নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এই র‌্যালি এক নতুন ইতিহাস তৈরি করলো। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল ও বর্ণাঢ্য র‌্যালিটি শহরের ফুলবাড়িতে আজিজুল হক কলেজের পুরাতন ভবন থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ প্রায় ৫ কিলোমিটার প্রধান সড়ক অতিক্রম করে বগুড়া পুলিশ লাইন্সে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালির উদ্বোধন করে প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ তার বক্তব্যে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আজকের এ
    
আয়োজন এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। ঘরে-বাইরে সবখানেই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বগুড়া জেলা পুলিশ যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। তিনি আরও বলেন, নারীরা এগিয়ে গেলেই দেশও এগিয়ে যায়। সামাজিকভাবে নারীরা স্বাবলম্বী হলে দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হয়। পুলিশ সুপার মোঃ আলী আশরাফ ভূঞা বিপিএম’র সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সরকারি আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ শাহজাহান আলী, বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য্য শংকর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বগুড়ার সভাপতি তৌফিক হাসান ময়না, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউএনএফপিএ’র রুমানা পারভীন, আলোকিত বাংলাদেশ’র ফেরদৌসী আকতার রুনা, কবি সিকতা কাজল ও র‌্যালিতে অংশ নেওয়া পুলিশ লাইন্স স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী খায়রুন নাহার খুশি।
জেলা পুলিশ সুপার মোঃ আলী আশরাফ ভূঞা বিপিএমসহ সদ্য পদোন্নতি পাওয়া চার পুলিশ সুপার যথাক্রমে আরিফুর রহমান মন্ডল বিপিএম-বার, মোকবুল হোসেন, আব্দুল জলিল পিপিএম ও সফিজুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মালেক, দু’জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী ও গাজিউর রহমান এবং ৫ জন সহকারি পুলিশ সুপার যথাক্রমে আনোয়ার হোসেন, মশিউর রহমান, তাপস কুমার পাল, আলমগীর রহমান ও কুদরত-ই-খুদা এ সাইকেল র‌্যালিতে অংশ নিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এছাড়াও র‌্যালিতে পুলিশের সুসজ্জিত বাদক দল, ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন অংশগ্রহণ করে। সকালে র‌্যালিটি যখন কলেজ মাঠ থেকে বের হয় তখন রাস্তার দু’পাশ ছিল উৎসুক মানুষের লক্ষ্যণীয় ভীড়। এছাড়াও বাসা বাড়ির ছাদে-জানালাগুলোতে অসংখ্য কৌতুহলী চোখ তাদের দৃষ্টি রেখেছিল সাইকেল র‌্যালিতে। অনেকে করতালি দিয়ে র‌্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দিত করেছে। ৫ কিলোমিটার রাস্তা র‌্যালির জন্য নির্বিঘœ করতে জেলা পুলিশের ৪ শতাধিক পুলিশ সদস্য ছিল তৎপর। এছাড়াও রেড ক্রিসেন্টের ৩৮ জন সদস্য স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত ছিল, ছিল পুলিশের এ্যাম্বুলেন্সও।
র‌্যালিতে অংশ নিয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়ন স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী উম্মে তামান্না মেধা উচ্ছ্বসিত। সে জানায়, ‘খুবই ভালো লাগেছে। ক্লাসে স্যাররা যখন এরকম একটি র‌্যালিতে অংশগ্রহণের কথা বললেন, তখন কোন কিছু না ভেবেই হ্যাঁ বলেছি। এরকম একটি কাজের অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।’ বগুড়া ইসলামিক মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সুবর্ণা রায় রাজভর জানায়, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল ছোট কোন আয়োজন। কিন্তু এখানে এসে বিশ্বাসই হচ্ছেনা এত বড় আয়োজনে আমি সাইকেল চালাবো। এত বড় মহৎ কাজের আমি একটি অংশ এটা ভেবে খুবই ভালো লাগছে।’ রানীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ফেরদৌস আকতার দোলন জানায়, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আজকের এ সাইকেল র‌্যালি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। এরকম আয়োজন নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মানুষকে যেমন সচেতন করবে তেমনি তারাও এতে সচেতন হতে পারবে।   
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউএনএফপিএ’র আস্থা, বগুড়ার সহযোগিতায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বগুড়া পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহাদৎ আলম ঝুনু। ব্যালি শেষে পুলিশ লাইন্স মাঠে অশংগ্রহকারী শিক্ষার্থী ও সুধি মন্ডলী নারী নির্যাতন প্রতিরোধে স্ব স্ব অবস্থান থেকে কাজ করার শপথ গ্রহণ করেন। এতে শপথ বাক্য পাঠ করান সদ্য পদোন্নতি পাওয়া পুলিশ সুপার মোকবুল হোসেন। এরপর পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এতে পুরস্কার বিতরণ করেন পুলিশ সুপার। শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য এ উপলক্ষে এর আগের দিন এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। র‌্যালি আয়োজনের সহযোগিতায় ছিলো আস্থা প্রকল্প। র‌্যালিতে ছিলো ব্যান্ডদল, ঘোড়া গাড়িসহ নানা দর্শনীয় উপস্থাপনা। ব্যতিক্রম এই আয়োজন দেখতে শহরের কলেজ রোড থেকে পুলিশ লাইন পর্যন্ত রাস্তার দু’ পার্শ্বে লোকজন ভীড় জমায়। পুলিশ লাইন্সে গিয়ে র‌্যালিটি শেষ হওয়ার পর সেখানে শপথ বাক্য পাঠ করান হয়।