* সমগ্র এলাকা রণক্ষেত্র * যান চলাচল বন্ধ * অতিরিক্ত পুলিশ-র‌্যাব মোতায়েন

টঙ্গীতে তাবলীগ জামাতের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত সহস্রাধিক

 টঙ্গীতে তাবলীগ জামাতের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত সহস্রাধিক

মো: আনোয়ার হোসেন, টঙ্গী (গাজীপুর) : টঙ্গীর জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলীগ জামাতের দিল্লি মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ আহমাদ কান্ধলভির অনুসারী এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার মাওলানা যোবায়ের হোসেন অনুসারীদের দুই পক্ষের মধ্যে গতকাল শনিবার বেলা ১১টার পর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ঈসমাইল হোসেন (৬৫) নামে এক মুসল্লি নিহত ও উভয় পক্ষে সহস্রাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় টঙ্গী, উত্তরা, তুরাগসহ আশপাশের এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
জানা যায়, গত ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাবলীগ জামাতের দিল্লি মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ আহমাদ কান্ধলভির অনুসারীদের ইজতেমা ময়দানে প্রতি বছরের ন্যায় জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দেওবন্দ মাদ্রাসার মাওলানা যোবায়ের হোসেন গ্রুপ তাদের ময়দানে ঢুকতে বাধা সৃষ্টি করে এবং আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের পূর্ব ঘোষিত জোড় ইজতেমা পালনের জন্য ময়দান দখল করে প্রস্তুতি নিতে থাকে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপের মধ্যকার বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। গতকাল শনিবার বাদ ফজর নামাজের পর সাদ গ্রুপ ময়দানে প্রবেশ করতে চাইলে যোবায়ের গ্রুপ ময়দানের সকল প্রবেশ পথ বন্ধ করে পাহারা বসায়। পরে সাদ গ্রুপ টঙ্গী কামারপাড়া সড়কসহ ময়দানের চারপাশ ঘিরে রাখে এবং সেখানেই জোড় ইজতেমা করার সিদ্ধান্ত নেয়। একপর্যায়ে দুপুর ১১টায় হঠাৎ রব ওঠে উভয়পক্ষের সিদ্ধান্তে সকল মুসল্লি ময়দানে নামাজ পড়বেন এবং এক সাথে ময়দানে জোড় পালন করবেন। সিদ্ধান্ত প্রচারের মাধ্যমে সাদ গ্রুপের মুসল্লিরা ময়দানে প্রবেশ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে করে উভয় পক্ষের শত শত মুসল্লি আহত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ময়দান থেকে বের হয়ে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার সরকারি হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে ভিড় জমাতে দেখা যায়। এত সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইজতেমা ময়দানের চতুর্দিকের প্রবেশ পথে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন মুহূর্তে আরও ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এ সময় টঙ্গী ইজতেমা ময়দানের সামনের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই উত্তেজনায় ঢাকা থেকে বিমানবন্দর হয়ে ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে দূর পাল্লার বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশসহ র‌্যাব মোতায়েন করেছে। গাজীপুর মেট্রো পুলিশের কমিশনার, স্থানীয় জেলা প্রশাসক, সংসদ সদস্যসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
একটি বিশেষ সূত্র জানায়, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তাবলীগ অনুসারী দুই পক্ষের নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে সরকার জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব গত মাসে স্থগিত ঘোষণা করে। দেওবন্দপন্থিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার গত শুক্রবার এক আদেশে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোটের আগে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করে একটি নির্দেশনা জারি করে। এরপরও দিল্লি মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ আহমাদ কান্ধলভির অনুসারীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমা করার ঘোষণা দেন। এতে দেওবন্দ অনুসারী মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা দিন কয়েক আগে ইতজেমা মাঠ দখল করে সব ক’টি প্রবেশ পথ ও আশপাশে পাহারা বসায়।
অপরদিকে মাওলানা সাদ’র অনুসারীরা ফজরের নামাজের পর ইজতেমা ময়দানে প্রবেশকালে প্রতিটি গেটে তালাবদ্ধ দেখতে পেয়ে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রবেশ পথের সামনে ও সড়কসহ টঙ্গী থানা গেটে অবস্থান নেয়। বেলা ১১টার পর উভয়পক্ষের মুসল্লিদের মধ্যে সংঘর্ষে মো. সাইফুল ইসলাম (৪০), মাওলানা তাওহিদুল ইসলাম (৫৫), হাফেজ আবু বক্কর (৩৫), মো. গোলাম কিবরিয়া (৪২), জুয়েল (১৮), হাজী মো. রেজাউল করিম (৪৫), আশরাফুল ইসলাম (২৪), মতিউর রহমান (৪২), মাহমুদ হাসান (৩২), শামীম আহমেদ (২৩), মনিরুল ইসলাম (২৫) মানিক হোসেন (৩৩), দাউদ আহমেদ (৩৪), তাহের আলী (৪৪), আবু নাঈম (২৩), আবুল কালাম আজাদসহ (৪৪) সহস্রাধিক মুসল্লি আহত হন। এদের মধ্যে বেশির ভাগ মুসল্লিরই মাথা, নাক ও পিঠে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অঝোরে রক্ত ঝরতে দেখা যায়।
এ দিকে জোড় ইজতেমায় আসা সাদ সমর্থক রফিকুল ইসলাম জানান, আমরা গতকাল শনিবার সকাল থেকে জোড় ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে ইজতেমা ময়দান অভিমুখে যাচ্ছিলাম। ওই পক্ষ আমাদের ময়দানে প্রবেশে বাধা দেয়। আমরা শতবার বলা সত্ত্বেও আমাদের ময়দানে ঢুকতে দেয়নি। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। আমরা মাঠে প্রবেশ করতে চাই। হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও জানান, আমরা কারো ওপর কোনো ধরনের হামলা করিনি।
অপরদিকে কামারপাড়া রোডে অবস্থান নেয়া জুবায়েরের অনুসারীদের জটলার মধ্যে বাব উস সালাম মাদ্রাসার ছাত্র মো. হানিফ বলেন, গতকাল ভোর থেকেই সাদের লোকজন ইজতেমা ময়দানের দিকে আসতে থাকে। আমাদের লোকজন তাদের ময়দানে প্রবেশ না করতে অনুরোধ সত্ত্বেও তারা কোনো কথা না শুনে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে আমাদের কয়েকশ’ মুসল্লি আহত হন।
উপমহাদেশে সুন্নি মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলীগ জামাতের মূলকেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সাদের দাদা দিল্লি মারকাজের শীর্ষ মুরুব্বী প্রয়াত মাওলানা ইলিয়াছ আহমাদ কান্ধলভি ১৯২০ তাবলীগ জমায়েতের সূচনা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য স্ব-প্রণোদিত হয়ে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিষিদ্ধ। মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এ জমায়েতের নেতৃত্ব দেন। তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বীর দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর শীর্ষ আমিরসহ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। সেই কমিটির মুরুব্বী মাওলানা যোবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ শীর্ষ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের প্রথায় ফিরিয়ে আনেন। এ অবস্থায় মাওলানা যোবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময়ে মাওলানা সাদের বক্তব্য নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়। নেতৃত্ব নিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমার সময়। কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা সাদ কান্ধলভি ঢাকায় এসে বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারের মধ্যস্থতায় ইজতেমায় অংশ না নিয়েই তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়েছিল। বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে ওই বিরোধের জের চলছিল বছরজুড়ে। গত এপ্রিলে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সাদের অনুসারীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর টঙ্গীতে জোড় ইজতেমা এবং ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে দেওবন্দপন্থিরা ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর জোড় ইজতেমা এবং ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের কথা জানায়। দুই পক্ষ আলাদাভাবে ইজতেমা করার ঘোষণা দিলে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়।
সাদপন্থি হিসেবে পরিচিত তাবলীগ জামাতের শুরা সদস্য মাওলানা সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম বলেন, ওই পক্ষের লোকজন কয়েক দিন ধরে মাঠ দখল করে রেখেছে সেখানে আমাদের কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। জোড় ইজতেমায় যোগ দিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসল্লিরা ময়দানে যাওয়ার চেষ্টা করলে তারা বাধা দিচ্ছে। এ কারণে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মাওলানা জুবায়েরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত তাবলীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এর জের ধরে গতকাল শনিবার সকালে এক পক্ষ গাজীপুরের দিকে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর এলাকায় অপর পক্ষ তাদের বাধা দেয়। এ সময় তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর তাবলীগ জামাতের এক পক্ষ বিমানবন্দর সড়কের এক পাশ বন্ধ করে রাখে।
টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) বলেন, মুসল্লিরা টঙ্গী কামারপাড়া সড়ক অবরোধ করে রেখেছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশসহ র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পারভেজ হোসেন বলেন, এক সাথে রক্তাক্ত জখমের এত রোগী টঙ্গী হাসপাতালে আর কখনও আসেনি। আমরা সকলে মিলে এদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছি।