* ‘লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রামের আদালত’

চট্টগ্রামে জঙ্গি আস্তানা থেকে দুই লাশ ও অস্ত্র উদ্ধার

 চট্টগ্রামে জঙ্গি আস্তানা থেকে দুই লাশ ও অস্ত্র উদ্ধার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : মিরসরাইয়ে জঙ্গি দমন অভিযানে নিহতরা চট্টগ্রামের আদালতে নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা নিয়েই জোরারগঞ্জের সোনাপাহাড় এলাকায় ওই বাড়িতে উঠেছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেছেন, সোনাপাহাড়ের ‘জঙ্গি আস্তানা’ চৌধুরী ম্যানশনে যেসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের মিল রয়েছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি দল জেএমবির চার সদস্যের অবস্থানের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একতলা ওই টিনশেড বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করেন র‌্যাব সদস্যরা। দীর্ঘ সময় দুই পক্ষের গোলাগুলি চলার পর ভোরের দিকে ওই বাড়ির ভেতরে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকালে র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ভেতরে ঢুকে দুই পুরুষের ছিন্নভিন্ন লাশ পায়, যাদের গায়ে ছিল ‘সুইসাইড ভেস্ট’।

তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় একটি একে-২২ রাইফেল, পাঁচটি অবিস্ফোরিত আইইডি, তিনটি পিস্তল, গোলাবারুদ এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম। গতকাল শুক্রবার দুপুরের আগে আগে অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে মুতফি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, আগে গ্রেফতার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘জেএমবির একটি গ্রুপের’ সক্রিয় থাকার তথ্য পান। জানতে পারেন, ওই জঙ্গিদের কাছে ‘বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ’ আছে। তারা যে যোগাযোগ করে সেটা র‌্যাব ইন্টারসেপ্ট করতে সক্ষম হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আজকের অভিযান। জঙ্গিরা একটি ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ করছে খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে জোরারগঞ্জের ওই বাড়ি চিহ্নিত করে ঘিরে ফেলেন র‌্যাব সদস্যরা। তখন ভেতর থেকে জঙ্গিরা টের পেয়ে গুলিবর্ষণ করে। এবং বেশ কয়েকটি আইইডির বিস্ফোরণ ঘটায়।

পরে বেশ কিছুক্ষণ গোলাগুলি চলতে থাকে। প্রায় ভোরের দিকেই বলা চলে, ভেতরে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। ওই বিস্ফোরণে বাড়ির টিনের চাল উড়ে যায়। ঢাকা থেকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সকালে ওই বাড়ির আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে দুটি আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) পান। পরে বাড়ির ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় আরও তিনটি আইইডি, সেই সঙ্গে অন্যান্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক। বিস্ফোরকগুলো উদ্ধার করে বাড়ির পাশের খোলা জায়গায় নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটান তারা। মুতফি মাহমুদ খান বলেন, এরা সবাই জেএমবির একটি গ্রুপের সদস্য। এ ধরনের একে ২২ রাইফেল হলি আর্টিজানেও ব্যবহার হয়েছিল। এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, যাতায়াতের সুবিধার জন্য জোরারগঞ্জের ওই এলাকায় মহাসড়কের পাশে ওই বাসা ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা। খুব তাড়াতাড়ি চট্টগ্রামে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল তারা। কিছু ডকুমেন্টসও পেয়েছি। চট্টগ্রাম আদালতে তাদের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল। অভিযানে গোলাগুলির কারণে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে নিয়ন্ত্রিতভাবে আবার যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

বিএসআরএম স্টিল মিল ও বারইয়ার হাঁটের মাঝামাঝি এলাকায় মহাসড়কের পাশে ‘চৌধুরী ম্যানশন’ নামে ওই বাড়ির মালিক মাজহারুল চৌধুরী ঠিকাদারী ব্যবসা করেন, থাকে। জোরারগঞ্জ এলাকায় আরেক ভাড়া বাসায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। বাড়ির মালিক মাজহারুল এবং কেয়ারটেকার ‘হক সাহেব’সহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাব-৭ এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার সাফায়াত জামিল ফাহিম জানান, গত মাসের শেষ দিকে দুই পুরুষ ও এক নারী মাসে পাঁচ হাজার টাকায় ওই বাসা ভাড়া নেয়। তাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অভিযান শেষে বাড়ি থেকে দুই পুরুষের ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হলেও কোনো নারীকে সেখানে পাওয়া যায়নি জানিয়ে এ র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, নিহত দুইজন সুইসাইড ভেস্ট লাগিয়ে ওই বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

তিনি বলেন, বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্র না রাখায় জঙ্গিদের বিস্তারিত পরিচয় এখনও জানা যায়নি। মাজাহারুল চৌধুরী, কেয়ার টেকার হক সাহেব ছাড়াও বিএসআরএম-এ কর্মরত এক শ্রমিককে র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে রেখেছে জানিয়ে স্কোয়াড্রন লিডার ফাহিম বলেন, গতরাতে কেয়ারটেকার ওই বাড়িতে ছিলেন না। তার ঘর থেকে নাজমুল ইসলাম নামের ওই শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুতফি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জেএমবি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত আছে। হয়ত একসময় যেরকম সুসংগঠিত ছিল, নেতৃত্ব ছিল, সে অবস্থায় এখন নেই। তাদের কিছু আইসোলেটেড গ্রুপ চেষ্টা করছে পলাতকদের সক্রিয় করে নতুন সদস্য নিয়ে সক্রিয় হওয়ার জন্য, নাশকতা করার জন্য। জোরারগঞ্জের ওই আস্তানায় অন্য যারা ছিল, তাদেরও খুঁজে বের করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।