গ্রাম্য মাতবরদের ফতোয়া প্রায়শ্চিত্তের নামে হিন্দু তরুণীর মাথা ন্যাড়া

 গ্রাম্য মাতবরদের ফতোয়া প্রায়শ্চিত্তের নামে হিন্দু তরুণীর মাথা ন্যাড়া

নীলফামারী প্রতিনিধি: গ্রাম্য সালিশে জোর করে লক্ষ¥ীরাণী (১৭) নামের এক তরণীর  মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে গ্রাম্য মাতবররা।  প্রেমের টানে ভিন্ন ধর্মের এক ছেলের সাথে বাড়ি ছাড়ার অপরাধে হিন্দু শাস্ত্রমতে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করা হয়েছে দাবি সালিশে অংশ নেয়া মাতবরদের। গত  সোমবার রাতে ঘটনাটি ঘটে নীলফামারী জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের চাঁদেরহাট কলেজপাড়া গ্রামে।ওই তরুণী মাথা ন্যাড়ার বিচার দাবি করলেও সালিশে অংশ নেয়া প্রতিবেশীরা বলছেন, হিন্দু শাস্ত্রমতে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করানো হয়েছে।এলাকাবাসী জানায়, গ্রামের মৃত ধীরেন্দ্র নাথ রায়ের মেয়ে লক্ষ্মীরাণী রায় প্রেমের সম্পর্ক ধরে ২ জুলাই নিজ বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী কচুকাটা ইউনিয়নের দুহুলী গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে রবিউল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। সেখানে অবস্থানকালে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে গত ৯ জুলাই রাতে তাকে বাড়িতে ফেরৎ আনা নয়। এরপর ভোর চারটার দিকে প্রতিবেশীরা প্রায়শ্চিত্তের নামে তার মাথা ন্যাড়া করে দেয়।

লক্ষ্মী রাণী রায় (১৭) জানায়, বাবার অবর্তমানে ২০১৩ সাল থেকে জেলা শহরের পরচুলা তৈরির একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করি। বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়া আসার পথে পরিচয়ের সূত্র ধরে অটোবাইক চালক রবিউল ইসলামের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে দেড় বছর আগে। দু’জনের সম্পর্ক অটুট থাকায় গত ১ জুলাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে রবিউলকে বিয়ে করি এবং ২ জুলাই নিজবাড়ি ছেড়ে রবিউলের বাড়িতে উঠি। সেটি দুই পরিবার মেনে না নেয়ায় গতকাল মঙ্গলবার রাতে রবিউলের বাড়িতে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশের মাধ্যমে আমাকে বাবার বাড়িতে ফেরৎ আনা হয়।

লক্ষ্মী রাণী রায় (১৭) অভিযোগ করে বলে, আমাকে ফেরৎ আনার পর প্রতিবেশী লোকজন আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেন। এরপর আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তারা আমার মাথা ন্যাড়া করে দেন। রাজি না হওয়ায় মারধরও করা হয় আমাকে। আমি তাদের সব কথা মানতে রাজি আছি, কিন্তু মাথা ন্যাড়ার বিষটি মানতে পারছি না।
সেখানে প্রতিবেশীসহ অনেক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এসময় প্রতিবেশী দিনবন্ধু রায় (৪০) এবং সদানন্দ রায় (৪৫) ব্লেড দিয়ে আমার মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছেন।
মা বুলোবালা রায় (৪৫) জানান, প্রতিবেশীরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে লক্ষ্মী রাণীর মা বুলোবালা (৪৫) বলেন, মেয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান ধর্মে গিয়েছিল। তাকে প্রতিবেশীরা  ফিরিয়ে এনেছে।  মাথা ন্যাড়া করে প্রায়শ্চিত করিয়ে তাকে প্রতিবেশীরা গ্রহণ করে নিয়েছে সমাজে। এনিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই।
এসময় ওই তরুণীর দিদিমা বিজো বালা রায় (৬৫) বলেন, মেয়েটাতো নাবালক, তাকে ধীরে-শাস্তে  না বুঝিয়ে ধর্মের প্রায়শ্চিত্ত করা নামে সবাই জোর করে নাড়িয়া করে দিলো। এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নাড়িয়া না করেও ধর্মের প্রায়শ্চিত্ত করা যায়।

সালিশে অংশ নেয়া প্রতিবেশী বিবেকানন্দ রায় (৩৫), কনক চন্দ্র রায় (৪৫), সুধীর চন্দ্র রায় (৫৫), সুরেশ চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, ওই তরুণী হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলিম হয়েছিল। সেখান থেকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আনার জন্য প্রায়শ্চিত্তের অংশ হিসেবে তার মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হয়েছে। এখন অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতি চলছে। এটা হিন্দু ধর্মের রীতি-নীতি, এলাকার হিন্দু সমাজের লোকজন উপস্থিত থেকে ওই বিধান দিয়েছেন।এদিকে লক্ষ্মী রাণী রায়ের মাথা ন্যাড়া করা কাজে অংশ নেয়া সদানন্দ রায় (৩২) জানান, সমাজের সকল লোকজনের নির্দেশে  আমি লক্ষ্মী রাণীর মাথা ন্যাড়া করি। সমাজ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক। এমনকি আমিও যা করেছি তাও সঠিক। এখানে কেউ অপরাধী নয়।

এ বিষয়ে রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রুহুল আমিন বলেন, রবিউলের বাড়ি থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে এসে মেয়ের পরিবারের জিম্মায় দিয়ে যায়। এরপর আর কি হয়েছে তা জানি না। তবে সকালে শুনি প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মেয়েটির মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে। ধর্মের দোহায় দিয়ে তারা যে কাজ করেছে তা ঠিক করেনি। আমি একজন জনপ্রতিনিধ হিসেবে যারা এই কাজে অংশ নিয়েছে তাদের প্রত্যেকর বিচার দাবি করছি।
নীলফামারী কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের পুরোহিত অশোক কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, সনাতন হিন্দু ধর্মে মাথা ন্যাড়া করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। স্বইচ্ছায় প্রাশ্চিত্ত করতে চাইলে বিধান মতে চুলের অগ্রভাগে এক থেকে দেড় ইঞ্চি কেটে ফেলে তার প্রায়শ্চিত্ত করবে।  প্রায়শ্চিত্তের নামে মাথা ন্যাড়া করা ঠিক করেনি, এমন কোনো নিয়মও নেই।

মানবাধিকরা কমিশন নীলফামারী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান দুলাল বলেন, ধর্মের দোহায় দিয়ে প্রায়শ্চিত্তের নামে মেয়েটির মাথা ন্যাড়া করে দেয়া চরম মানবাধিকার লংঘন করা হয়েছে। যারা এই মানবাধিকার লংঘন করেছে তাদের প্রত্যেকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূল বিচার করা উচিৎ।
নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: বাবুল আকতার বলেন, এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে জেনেছি তাদের ধর্মীয় কিছু আচার অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় তারা ওই কাজটা করেছেন।