আন্দোলন না নির্বাচন

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আরো মতামত নেবে বিএনপি

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আরো  মতামত নেবে বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : আন্দোলন না নির্বাচন। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে দলীয় বিভিন্ন ফোরামের পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সাথে  মতবিনিময় করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বিএনপি। দলের দুই প্রধান নেতার অনুপস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে আরো মতামত নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে শিগগিরই দলের ৫০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং মহানগর ও কেন্দ্রীয় অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সুপার ফাইভ নেতাদের সাথে মতবিনিময় করতে চায় বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। এসব বৈঠকের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সেপ্টেম্বর মাসেই তাদের মতামত নিতে চায় দলটি। সরকারবিরোধী বিগত দুটি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় এবার দলের সকল পর্যায়ের নেতাদের মতামত নিয়েই করণীয় নির্ধারণ করতে চায় বিএনপি। তবে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে এসব বৈঠক করা সম্ভব হবে কিনা-তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয় রয়েছে দলটির।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় দন্ডিত হওয়ার পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। অন্যদিকে, উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লন্ডনে অবস্থান করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের এই দুই প্রধান নেতার অনুপস্থিতিতে আন্দোলন ও নির্বাচন বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার ৫ জন করে প্রায় চারশ’ নেতার সঙ্গে দুই দিনব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। ওই সভায় মাঠপর্যায়ের ১৬০ জন নেতার দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলন ও নির্বাচন প্রশ্নে মোটা দাগে চারটি বিষয়ে মতামত আসে। এক. খালেদা জিয়াকে আশু কারামুক্ত করতে হলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি স্বল্পকালীন কঠোর আন্দোলনের বিকল্প নেই। দুই. খালেদা জিয়াকে ছাড়া সংসদ নির্বাচন নয়। বেগম জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে গেলে গাজীপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মতোই পরিণতি হবে। তিন. নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ডান-বাম সব পক্ষকে একত্র করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে জামায়াতকে নিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে প্রয়োজনে স্বাধীনতাবিরোধী ওই দলটির সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। চার. ঢাকা মহানগরের চরম ব্যর্থতার কারণে বিগত আন্দোলন সফল না হওয়ায় এবার মহানগরকে সুসংগঠিত করেই আন্দোলনে নামতে হবে। সেই আন্দোলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণও থাকতে হবে।

তৃণমূল নেতাদের এসব মতামত নিয়ে গত ১১ ও ১৩ আগস্ট বৈঠক করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। ওই বৈঠকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য এবং সম্ভাব্য আন্দোলনের একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করে দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আগ্রহী দলগুলোর সাথে আরো আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। তবে আন্দোলন না নির্বাচন-সেই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি দলটির নীতি-নির্ধারকরা। আন্দোলন হলে কবে থেকে কিভাবে আর নির্বাচন হলে কোন প্রক্রিয়ায় হবে-সেই বিষয়ে দলের আরও বড় পরিসরে মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। এ লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভা ডাকার সিদ্ধান্ত হয়। ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির পর এই সভা আহ্বান করা হতে পারে। জানা গেছে, নির্বাহী কমিটির এই সভার জন্য এখন হল খোঁজা হচ্ছে। সুতরাং হল পাওয়ার ওপর সভার তারিখ নির্ভর করছে। তবে তার আগে দলের ৯টি মহানগর ও কেন্দ্রীয় ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সুপার ফাইভ নেতাদেরও মতামত নেবে বিএনপির হাইকমান্ড। আন্দোলন ও নির্বাচন বিষয়ে জেলা পর্যায়ের নেতারা যেসব প্রস্তাব বা মতামত দিয়েছেন, তার সঙ্গে মহানগর ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন এবং নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মতামত সমন্বয় করে দলীয় অবস্থান ঠিক করবে বিএনপি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি ও আন্দোলনের ব্যাপারে জেলার নেতাদের কাছ থেকে অনেক মতামত এসেছে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই ব্যাপারে আরো মতামত নেয়া হবে। আমরা শিগগির দলের মহানগর এবং কেন্দ্রীয় অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও মতামত নেব।

তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে বিএনপির মহাসচিব ইতোমধ্যে দলের ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদকমন্ডলীর সাথেও পৃথকভাবে মতবিনিময় করেছেন। সবার মতামতের ভিত্তিতেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করবো।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভার বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলার নেতাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে দলের আরও বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা করা হতে পারে। এর অংশ হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাও ডাকা হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়।

বগুড়া জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও শেরপুর উপজেলা সভাপতি জানে আলম খোকা দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় এখন কারাগারে রয়েছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বিদেশে। মিথ্যা মামলায় তাকেও সাজা দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে জেলা পর্যায়ের নেতাদের সাথে নীতি-নির্ধারকদের বৈঠক ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। এই প্রক্রিয়াকে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া উচিত। দেশনেত্রীর মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে তৃণমূলসহ দলের সব পর্যায়ের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতেই বিএনপির আগামীদিনের কর্মসূচি নির্ধারিত হওয়া উচিত।

জানা যায়, জেলা পর্যায়ের নেতাদের সাথে দলের নীতি-নির্ধারকদের বৈঠকে আন্দোলনের ধরণ ও কৌশল ঠিক করার বিষয়ে প্রয়োজনে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদেরও মত নেওয়ার প্রস্তাব আসে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সময়ের স্বল্পতাসহ নানা কারণে এখন দলের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামত নেয়া সম্ভবপর হবে না বলে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে।