কাঠবিড়ালির শীতকালীন খাদ্য সঞ্চয়
শালবনের পাশে ছোট্ট একটি টিলা ছিল। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো শালগাছটিতে থাকত এক চঞ্চল কাঠবিড়ালি। তার নাম ছিল গুনগুন। সারাদিন ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়ানো, ফল কুড়িয়ে খাওয়া আর লেজ নেড়ে খেলাই ছিল তার আনন্দ। কিন্তু হেমন্ত পেরিয়ে শীতের আভাস দিতেই গুনগুনের মনে অদ্ভুত এক চিন্তা ঢুকে পড়ল। সকালে কুয়াশা ঘন হতে লাগল, রাতে বাতাস ঠান্ডা হয়ে শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। গুনগুন বুঝতে পারল, সামনে কঠিন সময় আসছে। আগে সে যখন খিদে পেত, তখনই খাবার খুঁজে নিত। কিন্তু শীতে খাবার কমে যায় এই কথাটা তার মনে পড়ে গেল।
একদিন গাছের নিচে বসে সে দেখল, শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে, অনেক ফল পচে যাচ্ছে, পোকামাকড়ও আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। তখন গুনগুন সিদ্ধান্ত নিল, এবার সে শীতের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেবে। পরদিন ভোরে সে কাজে নেমে পড়ল। গাছের ফাঁকফোকর থেকে সে কুড়িয়ে আনল শক্ত বাদাম, শুকনো বীজ আর পাকা ফলের বিচি। যেগুলো সহজে নষ্ট হয় না, সেগুলোই সে বেছে নিল। প্রতিদিন অল্প অল্প করে খাবার জড়ো করতে লাগল গুনগুন। কখনো গাছের গর্তে লুকিয়ে রাখে, কখনো মাটির নিচে ছোট গর্ত করে পুঁতে রাখে। খাবারের জায়গাগুলো সে ভালো করে মনে রাখে, যাতে শীতে খুঁজে পেতে অসুবিধা না হয়। শুধু খাবার জমানোতেই সে থামল না। গুনগুন বুঝেছিল, শীতে শরীর গরম রাখাও খুব দরকার। সে নিজের থাকার জায়গাটাকেও ঠিক করতে লাগল।
গাছের গর্তে শুকনো পাতা, নরম ঘাস আর ছাল বিছিয়ে দিল। এতে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে পারে না, আর ভেতরটা থাকে আরামদায়ক। রাতে সে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে, লেজটা শরীরের চারপাশে জড়িয়ে নেয়, যেন ঠান্ডা ছুঁতে না পারে। কয়েকদিন পর শীত পুরোপুরি নেমে এলো। চারদিক সাদা কুয়াশায় ঢেকে গেল, গাছের ডাল বরফশীতল হয়ে উঠল। অনেক পশুপাখি তখন খাবারের জন্য এদিক-ওদিক ছুটছে। কিন্তু গুনগুন তাড়াহুড়া করে বের হয় না। তার কাছে আছে আগেই জমিয়ে রাখা শীতকালীন খাবার।
যখন খুব প্রয়োজন হয়, সে তার গোপন ভান্ডার থেকে বাদাম বা বীজ এনে খায়। এতে তাকে বেশি শক্তি খরচ করে ঠান্ডায় ঘুরে বেড়াতে হয় না। একদিন কয়েকটি ছোট কাঠবিড়ালি গুনগুনের কাছে এসে জানতে চাইল, সে এত নিশ্চিন্তে কীভাবে শীত কাটাচ্ছে। গুনগুন হেসে বলল, সময় থাকতে প্রস্তুতি নিলে শীত ভয় দেখাতে পারে না। খাবার জমিয়ে রাখা আর থাকার জায়গা উষ্ণ রাখা এই দুইটাই শীত থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো কৌশল। শীত শেষে বসন্ত এলে। গাছপালা আবার সবুজ হয়ে উঠল। গুনগুন তখন নতুন শক্তি নিয়ে ডাল থেকে ডালে লাফাতে লাগল। সে বুঝে গেল, বুদ্ধি আর আগাম পরিকল্পনা থাকলে যেকোনো কঠিন সময়ই সহজ হয়ে যায়। কাঠবিড়ালির শীতকালীন খাবার তাই শুধু পেট ভরানোর উপায় নয়, তা হলো ভবিষ্যতের জন্য সচেতন থাকার এক সুন্দর শিক্ষা।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/190315