প্রাণহীন বন মানে প্রাণহীন ভবিষ্যৎ
বন্যপ্রাণীরা শুধু জঙ্গলের বাসিন্দা নয়, তারা প্রকৃতির আত্মা, জীবজগতের পরিপূর্ণতা এবং আমাদের মানবিক চেতনার এক গোপন দিকপাল। তারা কথা বলে না, তবুও তাদের অস্তিত্বে বাজে পৃথিবীর নিগূঢ় সংগীত। তাদের পদচিহ্নে, দৃষ্টিতে ও নি:শ্বাসে আমরা পাই প্রকৃতির আদিম স্নেহ, নিঃশর্ত সহাবস্থানের দর্শন। কিন্তু আজ সেই স্নেহ, সেই সহাবস্থান, এবং সেই সংগীত সবই নিঃশব্দে বিলীন হচ্ছে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি এক সময় ছিল নানা রকম বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণভূমি। ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন, হাতির মিছিল, চিত্রা হরিণের লাফ, বনরুইয়ের নীরব চলন। ছিল বুনো হাঁসের উড়ে যাওয়া, ময়ূরের নৃত্য, শকুনের নিষ্পলক দৃষ্টি। এই সকল জীব ছিল আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত পাঠ, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আজ সেই পাঠ্য বইয়ের পাতায় পরিণত, সেই উত্তরাধিকার হয়ে উঠছে স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ।
বন্যপ্রাণীদের বিলুপ্তির পেছনে কেবল একটি কারণ নয় আছে বহুস্তর বিশৃঙ্খলা। বনভূমির লোভনীয় উচ্ছেদ, পাহাড় কেটে নগরায়ন, কৃষির অজুহাতে চর দখল, নির্বিচারে শিকার এবং চোরাচালান সব মিলে এক বিষম পরিবেশবিনাশ। মায়া হরিণ কিংবা শূকর যে ভূমিতে চিরকাল চরে বেড়াত, সে ভূমি আজ বহুতল ভবনের নিচে। যেই নদী হাতিদের জলপানস্থল ছিল, আজ সে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে বালুচরে। প্রাণীরা পলায়ন করে মানুষের আঙিনায়, আর মানুষ ভাবে তারা হুমকি। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য প্রাণীর উপরেই দাঁড়িয়ে। এক একটি প্রাণীর অস্তিত্ব মানে এক একটি পরিবেশীয় দায়িত্ব। হরিণ বন পরিষ্কার রাখে, বানর ফলের বীজ ছড়ায়, শকুন মৃতদেহ সরিয়ে সংক্রমণ রোধ করে, বাঘ খাদ্যচক্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার অর্থ, একটি ভূমিকা নিঃশেষ হওয়া যা মানুষের জীবনকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে প্রকৃতি ও প্রাণী চিরকাল এক অনবদ্য সৌহার্দ্যের প্রতীক ছিল। আমাদের লোককথায় পাখির ডাক, বাঘের বীরত্ব, হরিণের সৌন্দর্য, হাতির মহিমা গাঁথা। আজ আমরা সেই গল্প শুধু বলি, অথচ প্রাণীদের অস্তিত্ব সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে ভুলে যাই।
রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাণী সংরক্ষণের আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। বনরক্ষীরা সংখ্যায় কম, প্রভাবশালী শিকারিদের বিরুদ্ধে মামলা চলে না, পাচার রোধে সীমান্ত নজরদারি অপ্রতুল। গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার প্রায় অনুপস্থিত। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাণীপ্রেম বা পরিবেশচেতনা বিষয়ে পাঠ প্রান্তিক। সমাজে প্রাণী নিয়ে সহানুভূতি গড়ে ওঠে না, বরং উপহাস, ভয় কিংবা কুসংস্কারের জায়গা দখল করে নেয় শুভবোধ। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কি নেই? আছে শুধু সদিচ্ছা চাই। চাই সাহসিকতা, সদ্বিবেচনা ও নীতিগত অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। আইনকে কঠোর হতে হবে, প্রয়োগে হতে হবে স্বচ্ছ। প্রাথমিক শিক্ষায় পরিবেশচেতনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচারণা বাড়াতে হবে, বন্যপ্রাণী গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে, সর্বোপরি নাগরিক সমাজকে জাগ্রত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনকে সংবেদনশীল হতে হবে। একটি পাখির ডানায়, একটি হরিণের ছুটে যাওয়ার দৃশ্যে, একটি বাঘের গর্জনে যদি আমরা শিহরিত না হই তবে আমাদের সভ্যতা কেবল ইট, পাথর, প্রযুক্তি আর শুল্ক উন্নয়নের ফাঁকা বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে।
এই দেশ, এই মাটি, এই বনভূমি কেবল মানুষের জন্য নয় এটি সাপের, হরিণের, বানরের, বাঘের, শকুনেরও। আমরা যদি আজও সচেতন না হই, তবে একদিন আমাদের শিশুরা শুধুই চিড়িয়াখানায় কৃত্রিম গর্জন শুনে বড় হবে। তারা জানবে না, কী অসাধারণ সৌন্দর্য এক সময় ছিল এই দেশের বনভূমিতে। আমরা যদি সত্যিই মানুষ হতে চাই, তবে আমাদের সেই নীরব প্রাণগুলোর জন্য, যাদের কণ্ঠ নেই তাদের জন্য আমাদের কণ্ঠ তুলে ধরতেই হবে। এখনই, এই মুহূর্তে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189960