হঠাৎ বাড়লো ডলারের দাম

হঠাৎ বাড়লো ডলারের দাম

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম আবারও বেড়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৯ টাকায়। অথচ ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানি দায় পরিশোধে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ ব্যাংকের তুলনায় খোলাবাজারে প্রতি ডলারে ৪ টাকা ২০ পয়সা বেশি গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল কেনা এবং আমদানি দায় পরিশোধের চাপ বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও সেই অনুপাতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ছে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে খোলাবাজারে নির্ধারিত সীমার বেশি দামে ডলার বিক্রির চেষ্টা করলে মানি চেঞ্জারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। সংগঠনটি জানিয়েছে, ১২৮ টাকা ১০ পয়সার বেশি দামে ডলার বিক্রির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই সতর্কতার পরও খোলাবাজারে ১২৯ টাকায় ডলার বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে ব্যাংকিং চ্যানেলেও ডলারের দাম বেড়েছে। গত মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা ৭০ পয়সা দরে ডলার কিনেছে। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ক্রয়দর ছিল ১২৪ টাকা ৫৫ থেকে ১২৪ টাকা ৬০ পয়সা। একই সময়ে আমদানি দায় পরিশোধে ঋণপত্র নিষ্পত্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪ টাকা ৮০ পয়সায়। আগের দিন এই দর ছিল ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা। ফলে ব্যাংক ও খোলাবাজারের মধ্যে ডলারের দামে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

যে কারণে বাড়ছে ডলারের চাহিদা

ব্যাংকারদের মতে, আমদানি দায় পরিশোধের চাপই ডলারের দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোকে বেশি ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পেট্রোবাংলার আমদানি দায় মেটানোর প্রয়োজনীয়তাও বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ১২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

একই সময়ে সামগ্রিক পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজনও বেড়েছে।

অন্যদিকে বিদেশে ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খোলাবাজারে নগদ ডলারের চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ সীমিত থাকলে এই বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির পরও কমছে না চাপ

বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে আমদানি দায় পরিশোধের চাহিদা বেশি থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগেও বাজারের চাপ পুরোপুরি কমছে না।

বুধবার (৪ নভেম্বর) নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২২ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। পরে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করা হলেও কোনো ডলার বিক্রি হয়নি।

গত ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্স বাড়লেও বাজারে স্বস্তি নেই

দেশে ডলারের প্রধান উৎস প্রবাসী আয় ও রপ্তানি। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই খাত থেকে আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয়ের তুলনায় ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত না হওয়ায় বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে। তবে শুধু রেমিট্যান্স বাড়লেই বাজারের ভারসাম্য নিশ্চিত হয় না। রপ্তানি আয় দেশে আসার সময় এবং আমদানি দায় পরিশোধের সময়ের মধ্যেও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।

পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা

ডলারের দাম বাড়লে আমদানিকারকদের একই পরিমাণ পণ্য কিনতে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। এতে জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পণ্য আমদানির খরচ বাড়তে পারে।

আমদানিকারকেরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলে ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে। জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমলে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয়গ্রহীতারা প্রতি ডলারের বিপরীতে তুলনামূলক বেশি টাকা পান। তবে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেলে এই সুবিধার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।

বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রয়োজন ভারসাম্য

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ডলারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। এ জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার উদ্যোগ জোরদার, রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনা নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁদের মতে, শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189923