যে চার সৃষ্টিকে আল্লাহ নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন
আল্লাহ তাআলা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। তিনি সৃষ্টি করতে চাইলে ‘হও’ বললেই তা হয়ে যায়। তবে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি আসারে বলা হয়েছে, আল্লাহ চারটি বিষয় নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন: আরশ, কলম, জান্নাতুল আদন ও আদম (আ.)। (মুসতাদরাকে হাকেম: ৩২৮৩; নাকদুদ দারেমি: ৩৮)
এখানে ‘হাত’ বলতে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো কোনো হাত বোঝানো হয়নি। আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাই ‘নিজ হাতে সৃষ্টি’ দ্বারা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দান উদ্দেশ্য। নীচে এই চারটি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. আরশ: কোরআনে বিভিন্ন স্থানে আরশের কথা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহকে সেখানে ‘আরশের রব’ এবং ‘মহান আরশের অধিপতি’ বলা হয়েছে। ফেরেশতাদের মধ্যে একদল আরশ বহন করেন। তারা আরশের চারপাশে অবস্থান করে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করেন। কেয়ামতের দিন আটজন আরশ বহন করবেন বলেও কোরআনে উল্লেখ আছে। (সুরা আল-হাক্কাহ: ১৭)
২. কলম: লাওহে মাহফুজে সমগ্র সৃষ্টিজগতের তাকদির লিপিবদ্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ কলম সৃষ্টি করেন। এই কলমের মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে, সবকিছু লিখে রেখেছেন। হাদিসে আছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাকে বললেন, লেখো। কলম বলল, হে আমার রব, কী লিখব? আল্লাহ বললেন, কেয়ামত কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি বস্তুর তাকদির লিখে ফেলো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭০০)
ইমাম তহাবি (রহ.) বলেন, আল্লাহ তাআলা কলমের মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে, সবকিছুর তাকদির লিখে রেখেছেন। এখন সমগ্র সৃষ্টিজগতের সবাই মিলে যদি এমন কোনো বিষয় ঠেকানোর চেষ্টা করে, যা আল্লাহ ঘটার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন, তবু তারা তা ঠেকাতে পারবে না। আবার আল্লাহ যা ঘটার জন্য নির্ধারণ করেননি, সবাই মিলে চেষ্টা করলেও তা ঘটাতে পারবে না। কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটার, সবকিছু লিখে কলম শুকিয়ে গেছে। (আকিদাতুত তহাবি, ৫৩)
৩. জান্নাতুল আদন: কোরআনে একাধিক স্থানে ‘জান্নাতু আদন’-এর কথা এসেছে। সেখানে মুমিনদের জন্য চিরস্থায়ী বসবাস, পবিত্র জীবন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এই জান্নাতে যারা বসবাস করবেন, তাদের মর্যাদা, অর্থাৎ এই জান্নাত, আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন।
হজরত মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) একবার মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকদের সামনে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। এতে হজরত মুসার (আ.) সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কথোপকথনের বিবরণ এসেছে। মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন, জান্নাতবাসীদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে নিম্নস্তরের অধিকারী কে? আল্লাহ বললেন, সে এমন এক ব্যক্তি, যে জান্নাতবাসীদের জান্নাতে প্রবেশের পর সেখানে আসবে। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, অন্যরা তো নিজ নিজ মর্যাদার আসনে বসে গেছে এবং তাদের প্রাপ্য নেয়ামতও গ্রহণ করেছে! তখন তাকে বলা হবে, দুনিয়ার কোনো রাজাধিরাজের সমপরিমাণ রাজত্ব পেলে তুমি কি সন্তুষ্ট হবে? সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহ বলবেন, তোমাকে তেমন রাজত্ব দেওয়া হলো। সেই সঙ্গে আরও সমপরিমাণ, আরও সমপরিমাণ—এভাবে পাঁচবার। লোকটি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য এর দশ গুণ রয়েছে। সেখানে তোমার মন যা চাইবে এবং চোখ যা দেখে আনন্দিত হবে, সবই পাবে। লোকটি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি সন্তুষ্ট।
এরপর মুসা (আ.) জানতে চাইলেন, জান্নাতবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী কারা? আল্লাহ বললেন, তারা হলো সেইসব মানুষ, যাদের মর্যাদা আমি নিজ হাতে রোপণ করেছি এবং তাতে আমার সিলমোহর এঁটে দিয়েছি। তাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনও দেখেনি, কোনো কান কখনও শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরেও কখনও কল্পনা জাগেনি। (সহিহ মুসলিম: ১৮৯)
৪. আদম (আ.): হজরত আদমকে (আ.) আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। কোরআনে আছে, ইবলিসকে আদমকে (আ.) সেজদা করার নির্দেশ দেওয়া হলে সে অহংকারবশত তা অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ বলেন, ‘হে ইবলিস, আমি নিজ হাতে যাকে সৃষ্টি করেছি, তাকে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল?’ (সুরা স-দ: ৭৫)
শাফায়াতের দীর্ঘ হাদিসেও একই কথা বলা হয়েছে। কেয়ামতের দিন মানুষ হজরত আদমের (আ.) কাছে সুপারিশ চাইতে যাবে। তারা তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে, আল্লাহ তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৪০)
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189910