৫ মুসলিম দেশে যেভাবে ‘স্যরি’ বলা হয়

৫ মুসলিম দেশে যেভাবে ‘স্যরি’ বলা হয়

ভিড়ের রাস্তায় কারও গায়ে ধাক্কা লাগলে আমরা বলি ‘স্যরি’। কায়রোর কোনো গলিতে একই মুহূর্তে শোনা যেতে পারে ‘মা’লিশ’। ইস্তাম্বুলে বলা হয় ‘পারদন’ বা ‘আফেদেরসিনিজ’, তেহরানে ‘বেবাখশিদ’। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে ‘স্যরি’ বলা বা দুঃখ প্রকাশ করার ভাষা, ধরন ও ভঙ্গি বিভিন্ন রকম।

পাঁচটি মুসলিমপ্রধান দেশের ভাষায় ‘স্যরি’ বা ‘দুঃখিত’ বলার এই ধরনগুলো দেখা যাক।

মিসর: ‘আসিফ’ ও ‘মা’লিশ’

আরবি ভাষায় ‘দুঃখিত’ বোঝাতে সবচেয়ে পরিচিত শব্দ ‘আসিফ’। বক্তা পুরুষ হলে বলা হয় ‘আনা আসিফ’, নারী হলে ‘আনা আসিফা’। আরবিতে বিশেষণ লিঙ্গ অনুযায়ী বদলায়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ-ইয়াকুবের (আ.) ঘটনায় ইয়াকুব (আ.) ছেলে ইউসুফের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইয়া আসাফা আলা ইউসুফ’। অর্থাৎ ‘আসিফ’ শুধু ভদ্রতা প্রকাশ করার জন্য নয়, বরং গভীর দুঃখবোধ বোঝাতেও ব্যবহার করা যায়।

দৈনন্দিন জীবনে মিসরে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় ‘মা’লিশ’। মিসর ও লেভান্ত অঞ্চলে (সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন) এই শব্দের ব্যবহার ব্যাপক। কখনো এটি ছোট ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, কখনো ‘ঠিক আছে, ভাবনার কিছু নেই’, কখনো আবার কারও কষ্টে সমবেদনা জানানো। কেউ ‘আনা আসিফ’ বললে মিসরীয় শ্রোতা প্রায়ই জবাব দেন ‘মা’লিশ’। বড় ভুলের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ভাষায় বলা হয় ‘আ’তাযির’, অর্থাৎ ‘আমি ক্ষমা চাইছি’। মিসরের কথ্য ভাষায় আছে ‘হাক্কাক আলাইয়া’ অর্থাৎ ‘দোষটা আমারই’।

তুরস্ক: ‘ওজুর দিলেরিম’ ও ‘আফেদেরসিনিজ’ 

তুর্কি ভাষায় ‘ওজুর দিলেরিম’ মানে ‘আমি ক্ষমা চাই’। নিজের কাজের দায় নিয়ে ক্ষমা চাইতে এটিই স্বাভাবিক শব্দ। জোর বাড়াতে আগে ‘চোক’ (অনেক) বসানো হয়।

‘আফেদেরসিনিজ’ অর্থ ‘মাফ করবেন’ বা এক্সকিউজ মি। কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, পথ চাইতে বা হালকা অসুবিধার জন্য এটি বলা হয়। এর অনানুষ্ঠানিক রূপ ‘আফেদেরসিন’। সাধারণ কথাবার্তায় ‘পারদন’ও খুব চলে।

‘উযগুনুম’ আক্ষরিক অর্থে ‘আমি দুঃখিত’। এতে সহানুভূতির সুর বেশি, দোষ স্বীকারের ভার কম। কারও অসুস্থতার খবরে বা দুঃসংবাদে এটি মানায়। বন্ধুদের মধ্যে চলে ‘কুসুরা বাকমা’ (‘কিছু মনে কোরো না’)। উত্তরে কেউ কেউ বলেন, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ক্ষমা করুন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

ইন্দোনেশিয়া: ‘সায়া মিন্তা মা’আফ’

ইন্দোনেশিয়ায় দৈনন্দিন ক্ষমা চাওয়ার শব্দ ‘মা’আফ’। একটু পূর্ণাঙ্গ করে বললে হয় ‘সায়া মিন্তা মা’আফ’, অর্থাৎ ‘আমি ক্ষমা চাইছি’।

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদুল ফিতরের দিন সবাই সবার কাছে ক্ষমা চায়। ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছার সঙ্গে প্রায় অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় ‘মোহোন মা’আফ লাহির দান বাতিন’ অর্থাৎ প্রকাশ্য-গোপন, দেহ-মনের সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। এভাবে ঈদের দিন প্রতিবেশী, আত্মীয় ও সহকর্মীর কাছে গত এক বছরের সব ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া হয়। তরুণরা বড়দের হাতে চুমু দিয়ে বা হাত কপালে ঠেকিয়ে এই ক্ষমা চান। এই রীতির নাম ‘সালিম’। ইন্দোনেশিয়া ঈদ তাই উৎসবের পাশাপাশি সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার একটি সুযোগও।

ইরান: ‘বেবাখশিদ’ ও ‘মা’জেরাত মিখাহাম’

ইরানি সংস্কৃতিতে ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত শব্দ ‘বেবাখশিদ’ আক্ষরিক অর্থ ‘ক্ষমা করুন’। একই শব্দে ‘সরি’ ও ‘এক্সকিউজ মি’ দুটোই বোঝানো হয়। কাউকে ডাকতে, কথার মাঝে ঢুকতে বা দেরির জন্য এটি বলা চলে। শব্দটি একজনের সঙ্গে কথা বললেও বহুবচনের রূপেই বলা হয়, এটাই সৌজন্যের নিয়ম।

আরও বিনয়ী বা গম্ভীর ক্ষমাপ্রার্থনায় বলা হয় ‘ওজর মিখাহাম’ বা ‘মা’আজেরাত মিখাহাম’। এ ছাড়া ঘরোয়া আলাপে তরুণেরা বলেন ‘শেরমান্দেহ’, আক্ষরিক অর্থ ‘লজ্জিত’, মানে ‘আমার দোষ, লজ্জা পেলাম’।

পাকিস্তান: ‘মাফ কিজিয়ে’ ও ‘সরি ইয়ার’

উর্দুতে ভদ্র ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে চেনা রূপ ‘মা’আফ কিজিয়ে’ বা আরও নম্রভাবে ‘মা’আফ কিজিয়ে গা’। এটি লিঙ্গনিরপেক্ষ, তাই নারী-পুরুষ সবাই একইভাবে বলতে পারেন। বড়দের সঙ্গে বা পেশাগত জায়গায়ও এটি মানানসই। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বলা হয় ‘মা’আফ করো’।

আনুষ্ঠানিক ভাষায় পুরুষেরা বলেন ‘মা’যরাত চাহতা হুঁ’, নারীরা ‘মা’যরাত চাহতি হুঁ’। আরও গুরুগম্ভীর রূপ ‘মাঁয় মা’যরাত খাহ হুঁ’ অর্থাৎ আমি দুঃখ বা অপারগতা প্রকাশ করছি। অফিস-আদালতের ভুলের জন্য এটাই মানানসই। এ ছাড়া বন্ধুদের আড্ডায় তরুণরা বলে ‘স্যরি ইয়ার’।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189900