স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও নেই বগুড়া জেলার নির্দিষ্ট কোন আন্তঃনগর ট্রেন

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও নেই বগুড়া জেলার নির্দিষ্ট কোন আন্তঃনগর ট্রেন

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহর বগুড়া এছাড়াও উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলা।  ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য সুপরিচিত একটি জেলা বগুড়া । এটি মূলত উত্তরবঙ্গের একটি শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর। এখানে ছোট ও মাঝারি ধরনের নানা রকম শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও বগুড়া জেলা পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল। যা বর্তমানে মহাস্থানগড় নামে পরিচিত। বগুড়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়  এটি আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি। কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প কিংবা শিক্ষা—সবক্ষেত্রেই দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এই জেলার অবদান অনস্বীকার্য। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে উত্তরাঞ্চলে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও যেমন পঞ্চগড় জেলার জন্য পঞ্চগড় এক্সপ্রেস নীলফামারী জেলার জন্য নীলসাগর এক্সপ্রেস দিনাজপুরের জন্য একতা ও দ্রুতযান ইত্যাদি ট্রেন চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের রেলের  দ্রুত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটলেও শুধুমাত্র রেল সেবায় অবহেলিত এবং বঞ্চিত  বগুড়া জেলা। এক কথায় স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও চরম রেল বৈষম্যের শিকার হয়েছে বগুড়াবাসী। 

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম এই প্রধান জেলা শহরের নাম দিয়ে আজ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট বা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়নি যা বগুড়ার মানুষের জন্য আক্ষেপের বিষয়। বর্তমানে বগুড়া রেল স্টেশনের ওপর দিয়ে লালমনিরহাট জেলার জন্য বরাদ্দকৃত লালমনি এক্সপ্রেস, রংপুর জেলার জন্য বরাদ্দকৃত রংপুর এক্সপ্রেস এবং কুড়িগ্রাম জেলার জন্য বরাদ্দকৃত কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস দূরপাল্লার ট্রেনগুলো চলাচল করে । তবে এই স্টেশনটিতে বরাদ্দ থাকে অতি নগণ্য সংখ্যক আসন, যা বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বিন্দুমাত্র সক্ষম নয়। বগুড়ার যাত্রীদের জন্য এই ট্রেনগুলোতে সিট সংখ্যা খুবই সীমিত থাকার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় যার ফলে এই অঞ্চলের মানুষ রেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাধ্য হয়েই তাদের সড়ক পথ বেছে নিতে হচ্ছে  যার ফলে সড়ক পথে তাঁদের নানা ভোগান্তি দুর্ভোগ নিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে । অন্য দিকে ঢাকা কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে যারা বগুড়া আসতে চান তাড়াও অল্প সংখ্যক টিকিটের কারণে টিকিট না পেয়ে পুরো রংপুর বা লালমনিরহাট পর্যন্ত টিকিট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন যার ফলে অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয় বাড়ছে । 

এ জেলার কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ নিবিড়ভাবে জড়িত। উন্নত রেল যোগাযোগ থাকলে পণ্য পরিবহন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হত। কিন্তু অপ্রতুল রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অথচ সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগ অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। যা থেকে বগুড়ার মানুষ দীর্ঘদিন থেকে বঞ্চিত। বগুড়ার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেনের সংখ্যা, যাত্রার সময় এবং গন্তব্যের সঙ্গে যোগাযোগের সীমিত সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা বা সমালোচনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেন না পাওয়ায় অনেক যাত্রীকে বাস কিংবা অন্যান্য পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। 

ট্রেনের তুলনায় সড়কপথে যাতায়াতের ব্যয় বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এক ধরনের বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এছারাও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে যাতায়াতকারী রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে। অন্যদিকে যারা শিক্ষার্থী রয়েছে তারাও বিভিন্ন চাকুরির পরীক্ষা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে স্বল্প খরচে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে পারত তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। নিরাপদ সহজ ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগের অভাবে ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না তাঁরা সড়ক পথ ব্যবহার করায় পণ্যর ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। বগুড়ার নির্দিষ্ট আন্তঃনগর ট্রেন থাকলে খুব সহজে কৃষি পণ্য পরিবহণ সুবিধা হবে যা কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে এবং পরিবহণ ব্যয় কমাবে। এছাড়াও প্রতি ঈদে সড়ক পথে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ বাড়ে। সড়ক পথের আয়তনের তুলনায় যানবাহন বেশি হওয়াই যাত্রী দুর্ভোগ বাড়ে, যানজট সৃষ্টি হয় এবং সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তাই বগুড়ার মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বান্ধব স্বস্তিদায়ক  আনন্দময় ভ্রমণ নিশ্চিতে বগুড়া এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর বিকল্প নেই । 

অন্যান্য জেলার মত বগুড়া জেলার জন্য বগুড়া এক্সপ্রেস ট্রেন চালু হলে বগুড়ার সাথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হবে এবং বগুড়ার মানুষের নিরাপদ সহজ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত হবে।

লেখক : প্রকৌশলী ও কলামিস্ট ০১৭৩৭-৩৫০২১৪

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189798