নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে ব্যবসায়ী শ্রেণির দাপট দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের প্রান্তিকতা এবং জাতীয় নির্বাচনে ব্যবসায়ী শ্রেণির ব্যাপক আধিপত্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়।
আজ রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার মূল তথ্য তুলে ধরেন টিআইবির তিন গবেষক। এরপর গবেষণা প্রতিবেদনের সার্বিক তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
এতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর সকল পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যপদ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা অর্জনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি মূলত প্রতীকী অর্থেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এমনকি চারটি দলের গঠনতন্ত্রে এই বিধান অনুসারে কোনো লক্ষ্যমাত্রাই নির্ধারণ করা হয়নি।
টিআইবির তথ্যমতে, দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক। মাত্র ২টি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ বা তার অধিক নারী সদস্য রয়েছেন। এছাড়া ২১ থেকে ৩২ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছে ১টি দলে, ১১ থেকে ২০ শতাংশ রয়েছে ১২টি দলে এবং ১ থেকে ১০ শতাংশ নারী সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে ৯টি দলের কমিটিতে। অন্যদিকে ২টি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের হার শূন্য শতাংশ এবং ৬টি রাজনৈতিক দল এ সংক্রান্ত কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি।
দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোর চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো নারী সদস্য নেই। খেলাফত মজলিসের কমিটিতে সব পুরুষ সদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হলেও ৩৭ জন নারী সদস্যের মধ্যে মাত্র দুইজনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে এবং বাকিদের ক্ষেত্রে কেবল ‘৩৫ জন নারী সদস্য’ রয়েছে বলে দায়সারাভাবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া জাকের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে একজন নারী কর্মীকে পাঁচটি ভিন্ন পদে অন্তর্ভুক্ত করে মোট পাঁচবার গণনা করার মতো অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে।
জাতীয় সংসদে নারীরা সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ এবং সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। তবে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সরাসরি নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করে। দলগুলোর পক্ষে ‘যোগ্য নারী প্রার্থীর অভাব’ এবং ‘নারীরা সক্রিয় রাজনীতিতে কম আগ্রহী’ বলে অজুহাত দিয়ে থাকে। গঠনতন্ত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় পার্টি ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি তাদের গঠনতন্ত্রে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা উল্লেখ রাখলেও মনোনয়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিধান যথাযথভাবে পরিপালন করা হয়নি। টিআইবির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিগত পাঁচটি নির্বাচনে দলগুলোর সরাসরি নারী প্রার্থী মনোনয়নের গড় হার ৫ শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে।
বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১ হাজার ৫৬৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ৫৯ জন (৩.৭৬%)। ২০১৪ সালের দশম সংসদে ৫৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ১৯ জন (৩.৪৭%)। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদে ১ হাজার ৮৬১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ৬৮ জন (৩.৬৭%)। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদে ১ হাজার ৮৯৬ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৯৪ জন (৪.৯৬%)। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮৩ জন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.০৯ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলো কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার করলেও গবেষণার অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৩টি দলের একজনও নারী প্রার্থী ছিল না। বাকি ১২টি দলের মনোনীত নারী প্রার্থীর সম্মিলিত হার ছিল মাত্র ৩.১ শতাংশ। তবে একই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থীর হার কিছুটা বেশি- প্রায় ৭.৯ শতাংশ দেখা গেছে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও দলের প্রতি ত্যাগ ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারী কর্মীদের দলের প্রতি দীর্ঘ অবদান, মেধা কিংবা রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য, তোষণনীতি এবং পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতেই সিংহভাগ মনোনয়ন দেওয়া হয়, যা জাতীয় সংসদে নারীদের একটি ‘প্রতীকী প্রতিনিধিত্বে’ পর্যবসিত করেছে। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির দাপট দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক কর্মীদের চেয়ে প্রার্থীর অর্থ-প্রতিপত্তি এবং ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এমনকি প্রভাবশালী তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’-এর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংসদে ব্যবসায়ী প্রার্থী ও সংসদ সদস্য হওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থী ছিলেন ৪৭.৪ শতাংশ এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন ৫৬.৬ শতাংশ। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থীর হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬.৯ শতাংশে এবং সংসদ সদস্য হন ৫৭.৭ শতাংশ। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ৫১.২ শতাংশ ব্যবসায়ী প্রার্থীর বিপরীতে নির্বাচিতদের ৬০.৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদে ব্যবসায়ী প্রার্থীর হার দাঁড়ায় ৫৭.৬ শতাংশ এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে রেকর্ড ৬৫.৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর ৪৮.৫ শতাংশ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাওয়া প্রতিনিধিদের ৫৯.৯ শতাংশই ব্যবসায়ী শ্রেণির।
সব মিলিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, দেশের রাজনীতি ও সংসদ ধীরে ধীরে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী ও নারীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং অর্থ ও প্রভাবের জোরে সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হচ্ছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189409