জুলাই সনদের কোনো আইনি ভিত্তি নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাই সনদের কোনো আইনি ভিত্তি নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’-এর কোনো সরাসরি আইনি ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এর রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব আইনি ভিত্তির চেয়েও অনেক বেশি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সিরিজ সেমিনারের ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক পর্বে তিনি এ কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) সময় যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হলো, তার কি কোনো আইনি ভিত্তি আছে? নাই। কিন্তু এই রাজনৈতিক সমঝোতাটা আইনি ভিত্তির চেয়েও বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা শুধু সংবিধান সংস্কারই নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করাটা আরও বেশি জরুরি।’

সনদটির আইনি স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, যখন প্রশ্ন উঠেছিল জনগণ এটি চায় কি চায় না এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শেষ দিকে এসে এর আইনি ভিত্তি দেওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তখন বিষয়টি একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য সে সময় নানা ধরনের আলোচনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা তখনও বলেছিলাম আমরা সুপ্রিম কোর্টের কাছে যাই। কিন্তু কেউ আর রাজি হলো না। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হলে তারাও এই দায়িত্ব নিতে চায়নি। আদালত থেকে বলা হয়েছিল— এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়, আপনারাই রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করুন।’

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,  ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব না হলে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হারাতাম। তিনি বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানে সংকটের চেয়ে সুযোগ বেশি ছিল। কিন্তু মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষমতালিপ্সার কারণে সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাকশাল গঠন করেছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনাও বাবার পথ ধরে বাকশাল-২ গঠন করেছিলেন।’

 আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘বেশ কিছু কালাকানুন বাদ দেওয়ার মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানটি খুবই চমৎকার একটি সংবিধান হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে সেই কালাকানুনগুলো আবার যুক্ত করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাকশাল কোনো একদলীয় শাসন নয়; বরং এক ব্যক্তির শাসনের জন্যই বাকশাল করা হয়েছিল।’

সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান। ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ পুঁজির উৎপাদক ছিল না; বরং আওয়ামী লীগ ছিল পুঁজির লুণ্ঠনকারী। তৃণমূল পর্যায়ের এই আর্থরাজনৈতিক বাস্তবতা একসময় রাষ্ট্র নিজেও চর্চা শুরু করে, যার পরিণতি বাকশাল।’

আলোচক আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান কখনোই স্বৈরতন্ত্র তৈরি করে না; বরং ক্ষমতাসীন ব্যক্তির অভিপ্রায়ই স্বৈরতন্ত্র তৈরি করে দেয়। তা না হলে বাহাত্তরের সংবিধানের পরও শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল গঠনের প্রয়োজন হতো না।

সভাপ্রধানের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্‌সান মাহমুদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক চর্চায় জুলাই জাদুঘর সামনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে থাকবে।’

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর প্রথম পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189349