দুনিয়া-আখেরাতের সফলতার জন্য অপরিহার্য যে ৩ আমল
মাল্টিকালচারাল সোসাইটিতে যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ আছেন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন, সেখানে আমাদের কাজকর্ম, আমাদের আচরণ আমাদের দ্বীন সম্পর্কে, ধর্ম সম্পর্কে, আমাদের দেশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বা সর্বস্তরের মানুষকে ধারণা পেতে সাহায্য করবে। আমাদের পজিটিভ কাজকর্ম যেমন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে, আমাদের নেগেটিভ আচার-আচরণ সেটা আমাদের মানসম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে।
এজন্য আমাদের প্রত্যেকটা মানুষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে একটা গুনাহ করলেন, তার জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবেন; কিন্তু আপনার মুসলিম আইডেন্টিটি নিয়ে আপনি একটা অপরাধকর্ম করলেন, একটা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলেন, নিয়ম ভঙ্গ করলেন, তাহলে সেক্ষেত্রে এর ফলশ্রুতিতে মুসলিমদের প্রতি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের একটা নেগেটিভ ধারণা তৈরি হলো। আপনি একা হাজার হাজার মানুষের বদনামের ভাগী হওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে আপনার অপরাধের মাত্রাটাও সেরকম ভয়াবহ আকার ধারণ করল।
ঠিক একইভাবে, যদি আপনার একটা সুন্দর আচরণ, সুন্দর একটি কথা, ভালো একটি কাজের ফলে কোনোপ্রকার ইমেজ মুসলমানদের স্বপক্ষে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়, তাহলে আপনি সদকায়ে জারিয়ার মতো অফুরন্ত সওয়াবের ভাগীদার হলেন, যেটা আপনার-আমার প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে থাকা দরকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের প্রবাসী ভাইবোনেরা যারা যেখানেই আছেন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন, দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করতে দারুণ ভূমিকা রাখেন; কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের ভুল পদক্ষেপের কারণে আমরা আমাদের দেশের, তার চেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দ্বীনের দুর্নাম করে ফেলছি। এই জায়গাটাতে আমাদের বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে।
একজন মুসলিম সবসময় শৃঙ্খলায়, সর্বোচ্চ নিয়মকানুন মেনে চলায় বিশ্বাসী হবেন, অভ্যস্ত হবেন, এটি ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে। সেই ইমানদাররাই সফল হবে, সার্থক হবে, যারা কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে। এর মধ্যে প্রথম হলো, যারা তাদের সালাতে খুশু অবলম্বন করবে, নামাজে যারা পরিপূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে। এই নামাজে মনোযোগী মানুষগুলোই সফল হবে, সার্থক হবে কেয়ামতের ময়দানে।
যারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপের নামাজ পড়ে, কখনো পড়ে, কখনো পড়ে না, পড়লেও মনোযোগ নেই, ধীরস্থিরতা নেই, হুলুস্থুল করে, এই মানুষগুলোর নামাজ তাকে কখনো সার্থক করবে না, সফল করবে না।
মানুষের জীবনে অন্তত একটা জিনিস থাকা উচিত যে, সে একটা ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করবে না। হয়তো নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে, এদিকে আমার কাস্টমার চলে আসছে; আমি নামাজকে কম্প্রোমাইজ করে দিলাম কাস্টমারের জন্য, অথবা আমার কোনো স্বার্থ আসল, সে স্বার্থের কারণে আমি নামাজ পড়লাম না। আমার খুব বেশি ঘুম পাচ্ছে বা কোনো পার্থিব প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, আমি নামাজ পড়লাম না, তাহলে আমি নামাজকে কম্প্রোমাইজ করে ফেললাম।
ইমানদারের কাছে নামাজ এমন আমল, যেটাতে কোনো কম্প্রোমাইজ চলে না। আপনি রোজা রাখতে পারছেন না, অসুস্থ, আপনার জন্য অন্য সময় রোজা রাখার বিধান ইসলাম রেখেছে। কিন্তু নামাজ আপনি দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে পড়তে হবে, বসে না পারলে শুয়ে পড়তে হবে। যে কোনো ভাবে নামাজ আপনাকে আদায় করতেই হবে। অতএব এই একটা জায়গায় ‘নো কম্প্রোমাইজ’ লেভেলে আমাদের থাকতে হবে, যদি আমরা মুসলিম হতে চাই আল্লাহর খাতায়।
নামাজের পরে দ্বিতীয় যে বিষয়টি বলতে চাই, সেটি হলো আমাদের উপার্জন হালাল হওয়া। আমরা অনেকেই আছি যারা আমাদের উপার্জনে ভেজালের কারণে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে হয়তো পাকড়াও হয়ে যাব, ধরা পড়ে যাব। অতএব আল্লাহর কাছে যেন আমরা কেয়ামতের ময়দানে ধরা না পড়ি, সেজন্য আমাদের উপার্জনটা হালাল হওয়া দরকার।
আপনি কয়টা ওয়াজ মাহফিলের স্পন্সর করেছেন দেশে, আপনি কয়টা মাদ্রাসা চালান, কতজন হুজুরকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছেন এটা আল্লাহর কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনি কয়বার ওমরাহ করেছেন, কয়বার মক্কায় হাজিরা দিয়েছেন হজ করার জন্য সেটাও আল্লাহর কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আল্লাহর কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, আপনার প্রতিটি টাকা, প্রতিটি উপার্জন সম্পূর্ণ হালাল কি না।
যে ব্যবসা অসহায় মানুষকে পথে বসিয়ে দিতে পারে, যে ব্যবসা একজন অসহায় মানুষের কষ্টের কারণ হতে পারে, বদদোয়ার কারণ হতে পারে এই ব্যবসার সাথে ডাকাতি আর ছিনতাইয়ের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আমরা অনেকেই মনে করি যে, আমরা অনেক নামাজ-কালাম পড়লাম, দান-সাদকা করলাম, টুপি দিলাম, ভালো কিছু কাজ করলাম, আর পাশাপাশি যেভাবে খুশি সেভাবে উপার্জন করলাম, তাতে কিছু মানুষ মরে গেল, কিছু মানুষ রাস্তায় বসে গেল, জমি-জমা বিক্রি করে নিঃশেষ হয়ে গেল, সর্বস্বান্ত হয়ে গেল এটা দেখার কিছু নাই!
মনে রাখবেন, একটি মানুষের ‘আহ’ আপনার পুরো জীবনকে তাসের ঘরে পরিণত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আপনার চারপাশে খোঁজ করলে দেখতে পাবেন, কত মানুষ দুই হাতে উপার্জন করেছে, হালাল-হারাম বাছ-বিচার করেনি, মানুষের হক বিবেচনা করেনি, কেবল টাকা চিনেছে, একটা পর্যায়ে এসে এই টাকা তাকে দুনিয়াতেই কুরে কুরে শেষ করেছে দুরারোগ্য ব্যাধি দিয়ে, সন্তান-সন্ততিকে নেশাগ্রস্ত করে কিংবা পরিবারের মধ্যে অশান্তির সমুদ্রের ঢেউ চালিয়ে দিয়ে।
এই সময়টাতে ওই অসহায় মানুষগুলোর চেহারা ভেসে উঠবে, যাদের রক্ত চুষে আপনি উপার্জন করেছেন, সম্পদ করেছেন। এই একটি জিনিসের কারণে আমাকে দুনিয়াতে কড়া শাস্তি পেতে হবে, আখেরাতে তো আছেই।
নারীদের উচিত স্বামীকে সম্পূর্ণ হালাল উপার্জন করতে উৎসাহিত করা। স্ত্রী যদি শুধু দামি দামি জিনিসপত্র কেনা, শপিংয়ের চিন্তা এবং যে কোনো মূল্যে সৌখিন লাইফ লিড করতে হবে, সমাজের দশজনের সাথে আপনাকে তাল মিলিয়ে চলতে হবে—এই চিন্তার মধ্যে মগ্ন থাকেন, কেয়ামতের ময়দানে স্বামী একা জাহান্নামে যাবে না, স্ত্রীরও জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
আপনার স্বামী কোত্থেকে উপার্জন করেন, কীভাবে উপার্জন করেন, আপনার স্বামীর উপার্জনের পেছনে কোনো অন্যায় আছে কিনা, কোনো অবিচার আছে কিনা, কোনো জুলুম আছে কিনা, কোনো দায় আছে কিনা, এটি স্ত্রীকে নিশ্চিত করতে হবে।
আজকাল বেশিরভাগ ফ্যামিলিতে দেখা যায় সন্তান অমানুষ, ডাকাতের মতো হয়ে যায়, একটা বয়সে এসে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, কারণ সন্তান বাপ-মা চিনে না। যেই সন্তানের দেহকে হারাম দিয়ে গঠন করবে, সেই সন্তান আপনার খুব অনুগত হবে এটা হতেই পারে না। মনে রাখবেন, এই সন্তান আপনার অবৈধ উপার্জনের যে মাসুল, সেটা আপনাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করবে।
তাই যদি আমরা একটা জান্নাতি ফ্যামিলি চাই, হালাল টাকা আসুক, কোটি কোটি টাকা আসুক, অসুবিধা নেই; কিন্তু হারাম টাকা এক পয়সারও দরকার নাই, এই সিদ্ধান্তটা আমাদেরকে নিতে হবে। মানুষ হারাম উপার্জন করে সামাজিক অবস্থানের জন্য, তথাকথিত আপনার সামাজিক স্ট্যাটাসের জন্য। এই জিনিসটাকে পায়ের নিচে পিষ্ট করতে হবে।
সৎ মানুষ হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ পান না, তাকে হয়তো স্টেজে ডেকে মালা দেওয়া হয় না, তাকে হয়তো ক্রেস্ট দেওয়া হয় না, তাকে হয়তো কেউ সেভাবে খোঁজ করে না, তাকে হয়তো কোনো মসজিদ-মাদ্রাসার কমিটিতেও রাখা হয় না; কিন্তু তিনি চেষ্টা করেন সৎ থাকবার।
এই মানুষটা দুনিয়ার মানুষের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আরশের মালিকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেয়ামতের ময়দানে সেলিব্রেটি হবে এই মানুষগুলো, যে মানুষগুলো দুনিয়াতে সততার পথে চলার ব্যাপারে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ লেভেলে যেতে পেরেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সে তওফিক দান করুন।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189123