কাগজের নৌকা ও একফোঁটা বৃষ্টি

কাগজের নৌকা ও একফোঁটা বৃষ্টি

শ্রাবণের আকাশটা সকাল থেকেই ছাইরঙা মেঘে ভারী হয়েছিল। টিনের চালে ঝুমঝুম শব্দে বৃষ্টি নামতেই বাবলুর মনটা একলাফে বারান্দায় চলে গেল। বৃষ্টি পড়া মানেই তার কাছে একটাই কাজ, কাগজের নৌকা বানানো! বাবার পুরোনো বাংলা ক্যালেন্ডার আর খাতার ছেঁড়া পাতা দিয়ে বাবলু যত্ন করে তিনটে নৌকা বানাল। শুধু বানিয়েই ক্ষান্ত হলো না, পেন্সিল দিয়ে প্রতিটা নৌকার মাঝখানে একটা চিঠি লিখল: “নৌকাটি যে পাবে, সে কি আমার নতুন বন্ধু হবে?” বাসার পেছনের গলি দিয়ে একটা খালের মতো ড্রেন বয়ে গেছে। বর্ষার দিনে সেখানে চকচকে ঘোলা পানির তীব্র স্রোত তৈরি হয়।

বাবলু এক এক করে তিনটে নৌকাই পানির তোড়ে ভাসিয়ে দিল। দেখতে দেখতে লাল-নীল ছাপা কাগজের নৌকাগুলো খালের বাক ঘুরে উধাও হয়ে গেল। পুকুরপাড়ের বুড়ো করিম চাচা ছাতা মাথায় দিতে দিতে আগের দিন বলেছিলেন, “ওরে বাবলু, এই জল গড়িয়ে তো বড় নদীতে যাবে, তারপর সেখান থেকে সাগরে! তোর কাদা-মাখা চিঠি কি কেউ খুঁজে পাবে রে?” করিম চাচার কথা শুনে বাবলু মনে মনে ভাবত, সত্যিই তো! কোনো অজানা দ্বীপে হয়তো নদীর পাড়ে বসে কোনো এক রাজপুত্র তার কাগজের নৌকাটা কুড়িয়ে পাবে!

কিন্তু তিনদিন ধরে প্রতিদিন তিনটে করে মোট নয়টি নৌকা ভাসিয়েও যখন কোনো উত্তর এলো না, তখন আর ঘরে বসে থাকা গেল না। চার নম্বর দিনে বৃষ্টিটা একটু কমতেই বাবলু কৌতূহল সামলাতে না পেরে খালের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ড্রেনের পানিটা গিয়ে ঠিক কোথায় মিশেছে, আর তার চিঠিগুলো কোন পথে যাচ্ছে: তা আজ তাকে জানতেই হবে। মোড়ের মাথায় বড় আমগাছটার পর ড্রেনটা গিয়ে পড়েছে একটা নিচু কালভার্টের নিচে। কালভার্ট পার হয়ে জলটা ছপছপ করে ছড়িয়ে গেছে এক ফালি কচুরিপানায় ভরা ছোট ডোবায়। সেখানে গিয়ে বাবলু তো অবাক! কালভার্টের এক কোণে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের ভাঙা বালতি আর একটা লম্বা কঞ্চি হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক পুঁচকে মেয়ে। তার পরনে লাল ফ্রক, মাথায় একটা বড় কচুপাতা ছাতার মতো ধরা। কালভার্টের শুকনো একটা ইটের ওপর বাবলুর আগের দিনের কাদা-লাগা তিনটি নৌকা যত্ন করে তুলে রাখা।

পানিতে ভিজে কাগজগুলো শুকিয়ে একটু কুঁচকে গেছে। মেয়েটি খুব মন দিয়ে কঞ্চি দিয়ে কচুরিপানা সরিয়ে বাবলুর আজকের প্রথম নৌকাটি ধরে ফেলল। বাবলু বিস্ময় আর মৃদু বিরক্তি মিশিয়ে বলল, “এই! তুমি আমার চিঠি লেখা নৌকাটা ধরে ফেললে কেন? ওটা তো নদীতে যাওয়ার কথা ছিল!” মেয়েটি চমকে উঠে বাবলুর দিকে তাকাল। তারপর কচুপাতাটা একটু সরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “নদীতে গেলে তো এতক্ষণে ভিজে ডুবেই যেত! তোমার নৌকায় তো লিখা ছিল, ‘কে বন্ধু হবে?’ বর্ষায় এখানে কেউ খেলতে আসে না, তাই আমি একাই একাই কচুরিপানা সরাই, আর নৌকা খুঁজি।” কথাটা বলেই মেয়েটি তার ঝুলিসদৃশ ছোট ব্যাগ থেকে একটা শুকনো, জ্যামিতিক খাতার শক্ত বাসন্তী রঙের কাগজ বের করল।

সেটা বেশ কায়দা করে ভাঁজ করে আস্ত একখানা নতুন নৌকা বানিয়ে ফেলল। নৌকার গায়ে গাঢ় নীল কালির কলম দিয়ে বড় করে লেখা:  “আমি রাজি! আমার নাম বৃষ্টি।” মেয়েটি হাসিমুখে বাসন্তী রঙের নৌকাটা বাবলুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তুমি খালি পেন্সিল দিয়ে চিঠির নৌকা ভাসাও, কিন্তু উত্তরে তো কেউ নৌকা দেয় না! তাই আজ আম্মার খাতা থেকে এই পাতাটা ছিঁড়ে এনেছি। এবার দাও, দুজনে একসাথে ভাসাই!” শ্রাবণের মেঘের ফাঁক গলে তখন বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে কালভার্টের জলে। বাবলু আর বৃষ্টি দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুটো রঙিন নৌকা একসাথে পানিতে ছেড়ে দিল। বাসন্তী রঙের আর নীল ছাপার নৌকা দুটি কচুরিপানার পাশ কেটে হেলেদুলে একসঙ্গে ভেসে চলল।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/189041