আপাতত ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর চিন্তা নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
আপাতত ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো চিন্তা-ভাবনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আমদানি নির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। রমজান বা তার আগে-পরে বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছে সরকার।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমদানি নির্ভর পণ্যগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতি এবং আগামী রমজান বিবেচনায় নিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তেল, ছোলা, ডাল, চিনি সহ এসব পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য এই সরবরাহ যথেষ্ট।
ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এবং রমজানের আগে দাম বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘না, এই মুহূর্তে এরকম কোনো চিন্তাভাবনা নাই।’
তিনি বলেন, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা তেলের দাম নির্ভর করে উৎসের বাজারমূল্য এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর। উৎসে দাম বাড়লে বা পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেলে তার প্রভাব আমদানি করা পণ্যের দামে পড়বে। আবার উৎসের দাম ও পরিবহন ব্যয় কমলে পণ্যের দামও কমতে পারে।
রমজানের আগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা আগাম নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে জাহাজের গতিপথ দীর্ঘ হলে কিংবা পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।
আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে সরবরাহ সংকট এড়াতে সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, হঠাৎ কোনো পরিস্থিতির কারণে যেন বাজারে পণ্যের শূন্যতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত বুকিং ও পাইপলাইনে পণ্য রাখার মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের আগাম পণ্য বুকিং দিতে সরকার বাধ্য করতে পারে না বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমবেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। এখন কোনো ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট দামে পণ্য বুকিং দিতে বাধ্য করার পর এলসি খোলার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে তার দায় কে নেবে? একইভাবে পণ্য জাহাজে তোলার সময় পরিবহন ভাড়া নির্ধারিত হয়। ফলে সবকিছু আগাম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রমজান সামনে রেখে আমদানিকারকদের এলসি খোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই মুহূর্তে সেটার কোনো প্রয়োজন দেখছি না। ব্যবসায়ীরা যদি কোথাও কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন, আমাদের জানালে তখন আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি।’
এলসির মার্জিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা ব্যবসায়ীরা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংককে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানানো হবে। তবে এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো সমস্যা সরকারের নজরে আসেনি।
ছোলার দাম বেড়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে কী করা যায়, তা দেখছে সরকার। সবাই পণ্যের দাম কমাতে চান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজার স্থিতিশীলতার ব্যাখ্যা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এর দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা এবং ভোক্তারা বাজারে গিয়ে পণ্য কিনতে পারছেন কি না। অন্যটি হলো পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্য, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজার যে পর্যায়ে ধরে রাখা হয়েছে, তা ইতিবাচকভাবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
মৌসুমভেদে পণ্যের দামের ওঠানামা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সারা বছর প্রতিটি পণ্যের দাম একই রাখার মতো সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি। পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও মৌসুমি ব্যবধানের কারণে দাম বাড়তে পারে। একইভাবে শাকসবজির ক্ষেত্রেও মৌসুমি প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোল্ড স্টোরেজের ব্যবহার বাড়িয়ে কিংবা অফসিজনে উৎপাদনের ব্যবস্থা করে সারা বছর পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় ইতোমধ্যে সবজির দাম কমছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মঙ্গলবার ছিল এ বিষয়ে প্রথম দফার বৈঠক। আগামী এক বছরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা দ্রুত শেষ করে চুক্তির দিকে এগোতে চায় সরকার। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, হংকং, ওমান, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও এফটিএ আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এফটিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর যেসব বাণিজ্যসুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, এ ধরনের চুক্তি সেগুলো মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলেও জানান তিনি।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য মালয়েশিয়ার অনুকূলে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে বেশি পরিমাণে পাম অয়েল আমদানি করে। এফটিএ হলে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে এবং মালয়েশিয়ার বিনিয়োগও বাংলাদেশে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।