জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল দেওগ্রামে দেড়শত বছরের লাঠিখেলা ও মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড়
ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার দেওগ্রামে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও শনিবার বসেছে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও মেলা। দেড়শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এ আয়োজনকে ঘিরে উৎসবে মেতে উঠেছেন আশপাশের ১০টি গ্রামের নারী-পুরুষ।
ঢোলের বাজনা আর কাঁসার ঘণ্টার তালে তালে চলেছে লাঠির কসরত। কখনো প্রতিপক্ষের আঘাত, আবার কখনো কৌশলে তা প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ। লাঠিয়ালদের এমন শ্বাসরুদ্ধকর খেলা দেখতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের ভিড় জমে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও ক্ষেতলাল উপজেলার পশ্চিম দেওগ্রামের লাঠিয়ালরা এখনো ধরে রেখেছেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের এই সংস্কৃতি। প্রতিবছর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর তিন দিন পর শনিবার বসে এই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও মেলা। প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো এ আয়োজন দেখতে শুধু আশপাশের ১০টি গ্রাম নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও এসেছেন হাজার হাজার দর্শনার্থী।
এটি শুধু লাঠিখেলাই নয়, মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলা। জামাই-মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, বাড়িতে বাড়িতে চলছে বিশেষ খাবারের আয়োজন। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকা জুড়ে।
মেলায় বসেছে নানা রকমারি মিষ্টি, চিনির শাহী জিলাপি, বাঁশ-কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের দোকান। রয়েছে শিশুদের খেলনা ও প্রসাধনীর পসরাও। তবে মেলার মূল আকর্ষণ সেই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।
উপজেলার বিনাইগ্রাম থেকে আসা আইয়ুব আলী বলেন, ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা দেখার জন্য সন্তানদের মেলায় নিয়ে এসেছি। লাঠিখেলা দেখে সন্তানরা অনেক খুশি। সেই সাথে মেলার বিভিন্ন জিনিসপত্র ও খাবার কিনেছি। বিক্রেতার চেয়ে ক্রেতার ভিড় বেশি থাকায় জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বেশি মনে হলো।
লাঠিয়াল শহিদুল ও প্রবীণ লাঠিয়াল স্বাধীন হোসেন বলেন, বংশপরম্পরায় চলে আসছে এই লাঠিখেলার চর্চা। বাবা-দাদার কাছ থেকেই এ খেলা শিখেছেন তারা। কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই কেবল দর্শকদের আনন্দ দিতে তারা লাঠিখেলায় অংশ নেন। তবে সময়ের সাথে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ায় একদিন এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে বলে তাঁদের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, “সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রামবাংলার অনেক পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পশ্চিম দেওগ্রামের লাঠিয়ালরা নিজেদের আগ্রহ ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্বপুরুষদের এই সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আগামী প্রজন্মকে লাঠিখেলার সাথে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
আয়োজকদের দাবি, পশ্চিম দেওগ্রামের এই মেলা কেবল বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির প্রতীক। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মিলন রহমান জানান, লাঠিখেলা ও মেলায় দর্শনার্থীরা যেন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে চলাফেরা করতে পারেন, সেজন্য মেলা কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলা চলাকালে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/188507