পুরোনো অভ্যাস ছাড়ার সহজ উপায়
সুস্থ জীবনযাপন গড়ে ওঠে প্রতিদিনের নানা সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। আমরা অনেকেই জানি, সঠিক খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ব্যায়াম করা, তামাক বর্জন করা এবং অ্যালকোহল পান কমানো জরুরি। কিন্তু এসব অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ নয়। নিজেদের বর্তমান অভ্যাসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যেতে পারে, আমরা প্রত্যাশিত জীবনযাপন থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছি।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বাদ দিয়ে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে চাইলে কী করা উচিত? কোথা থেকে শুরু করা যায়? ‘আগামীকাল থেকে শুরু করব’-এই মানসিকতা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব?
অভ্যাস জটিল বিষয়
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) মতে, অভ্যাস হলো এমন একটি আচরণ বা আচরণের ধারাবাহিকতা, যা ভালোভাবে শেখা হয়ে গেছে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সচেতন ইচ্ছা বা চিন্তার তেমন প্রয়োজন ছাড়াই মানুষ সেই আচরণ করে।
আমাদের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলে অভ্যাস আরও শক্তিশালী হয়। তাই অভ্যাস বদলাতে পরিবেশ পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে স্কুলে কোমল পানীয়ের যন্ত্র সরিয়ে পানির ব্যবস্থা করা, শহরে সাইকেল চালানোর পথ বাড়ানো, তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিধিনিষেধ আরোপ এবং অ্যালকোহলের ওপর কর বসানো। বিপাকীয় সমস্যা মোকাবিলায় জাপানে কোমরের মাপ নেওয়ার উদ্যোগও এর একটি উদাহরণ।
অভ্যাসের শুরুতে থাকে কোনো সংকেত
আমাদের অনেক অভ্যাসের শুরু হয় নির্দিষ্ট সংকেত থেকে। জেমস ক্লিয়ার তার ‘অ্যাটমিক হ্যাবিটস’ বইয়ে বলেছেন, সংকেত থেকে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যা আচরণে রূপ নেয়। সেই আচরণ থেকে পুরস্কারের অনুভূতি তৈরি হলে অভ্যাস আরও শক্তিশালী হয়।
তবে সব সংকেত চেনা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আর্থসামাজিক অবস্থা, পারিবারিক সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য ও খাবারের পরিবেশ আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে। এসব সংকেত অনেক সময় অজান্তেই কাজ করে।
তাই নিজের লক্ষ্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। যেমন, অ্যালকোহল পান কমাতে চাইলেও এমন সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়ে কেউ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারেন, যেখানে অন্যদের কাছে অ্যালকোহল পান করাটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে অভ্যাস বদলানো কঠিন।
অভ্যাস পরিবর্তনের পথে অন্য বাধা
গভীর আবেগীয় চাহিদাও আমাদের অভ্যাসকে প্রভাবিত করে। জেমস ক্লিয়ারের মতে, উদ্বেগ কমানো, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া কিংবা অন্যের চোখে মর্যাদা বাড়ানোর জন্য আমরা কিছু আচরণ করি। এসব চাহিদা শনাক্ত করা কঠিন।
জেরেমি ডিন তার ‘মেকিং হ্যাবিটস, ব্রেকিং হ্যাবিটস’ বইয়ে বলেছেন, মানুষ প্রায়ই অভ্যাস পরিবর্তনকে বাস্তবের চেয়ে সহজ মনে করে। পরে বাধার মুখে পড়লে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একসঙ্গে অনেক অভ্যাস বদলানোর চেষ্টাও উল্টো ফল দিতে পারে। তাই একবারে জীবনযাপনের সবকিছু পরিবর্তন করতে যাওয়া ঠিক নয়।
কোন অভ্যাসটি পরিবর্তন করবেন?
- নতুন ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয় সাহায্য করতে পারে।
- বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করুন। অভ্যাস পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপ কীভাবে সম্পন্ন করবেন, তা আগে থেকে ভেবে নিন। এতে পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত কি না, বোঝা সহজ হবে।
- নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিন। পরিবেশের সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই যেসব বিষয় বদলানো সম্ভব, সেগুলো নিয়ে কাজ করুন।
- ছোট ধাপে এগোন। বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করুন। একটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরের ধাপে এগিয়ে যান।
লক্ষ্য মনে রাখুন। কেন অভ্যাসটি বদলাতে চান, তা নিয়মিত নিজেকে মনে করিয়ে দিন। এতে লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে।
পুরোনো অভ্যাসের বিকল্প খুঁজুন। পুরোনো অভ্যাস থেকে কী ধরনের আনন্দ বা তৃপ্তি পান, তা বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর একই চাহিদা পূরণ করে এমন স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নিন। প্রয়োজনে জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি বা ব্যক্তিগত প্রশিক্ষকের সহায়তা নিতে পারেন।
অভ্যাস পরিবর্তন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বাধাগুলো বুঝে ধীরে ধীরে এগোলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলা সম্ভব।
সূত্রঃ সাইকোলজি টুডে
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/188457