এক চার্জে ৭২৪ কিলোমিটার চলবে বিএমডব্লিউর নতুন বৈদ্যুতিক এসইউভি

এক চার্জে ৭২৪ কিলোমিটার চলবে বিএমডব্লিউর নতুন বৈদ্যুতিক এসইউভি

একবার চার্জে ৪৫০ মাইলের বেশি চলতে সক্ষম নতুন বৈদ্যুতিক স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) আনছে জার্মানির গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ। ২০২৭ সালের আইএক্স৫ মডেলের গাড়িটিতে থাকছে স্বয়ংক্রিয় দরজা, উন্নত চালক-সহায়তা প্রযুক্তি এবং বড় আকারের ব্যাটারি। তবে গাড়িটির নকশা নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পরীক্ষামূলক চালনায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা।

বিএমডব্লিউর নতুন এই বৈদ্যুতিক এসইউভি প্রতিষ্ঠানটির আইএক্স মডেলের কার্যকর উত্তরসূরি হিসেবে আসছে। পাশাপাশি এটি নতুন আইএক্স৩ মডেলের চেয়ে ওপরের অবস্থানে থাকবে এবং দুই সারির আসনবিশিষ্ট জ্বালানিচালিত এক্স৫-এর বৈদ্যুতিক বিকল্প হিসেবে বাজারে আসবে।

টানলেই খুলবে দরজা, ব্রেক চাপলে বন্ধ

গাড়িটির অন্যতম আকর্ষণ স্বয়ংক্রিয় দরজা। সামনের ও পেছনের দরজার ওপরের অংশে ছোট বিশেষ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে, যা হালকা টান শনাক্ত করতে পারে। টান দিলে দরজা নিজে থেকেই খুলে যাবে। আশপাশে মানুষ বা অন্য গাড়ি থাকলে দরজা যাতে ধাক্কা না খায়, সে জন্য এতে সেন্সরও রয়েছে। গাড়িতে উঠে ব্রেক প্যাডেলে পা রাখলে দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

পরীক্ষামূলক চালনায় দেখা গেছে, ব্যবস্থাটি দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করে। আগে বিভিন্ন বিলাসবহুল গাড়িতে এমন প্রযুক্তি থাকলেও ধীরগতি ও নির্ভরযোগ্যতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবহারকারীদের বিরক্তির কারণ হয়েছে। আইএক্স৫-এ দরজার এই ব্যবস্থা বাড়তি বিলাসিতার অভিজ্ঞতা দেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরীক্ষা করা গাড়িটি ছিল আইএক্স৫ ৬০ এক্সড্রাইভ সংস্করণ। এতে রয়েছে ৫৭০ অশ্বশক্তির মোটর এবং ৫৯৩ পাউন্ড-ফুট টর্ক। গাড়ির ভেতরে আরামদায়ক ম্যাসাজ সুবিধাযুক্ত আসনও রয়েছে। ম্যাট সিলভার রঙের বহিরাবরণ গাড়িটিকে অভিজাত চেহারা দিয়েছে, যদিও নকশাটি সবার পছন্দ নাও হতে পারে।

চালকের সঙ্গে সমন্বয় করবে সহায়ক প্রযুক্তি

আইএক্স৫-এ বিএমডব্লিউর ‘সিমবায়োটিক ড্রাইভ’ নামের চালক-সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। মহাসড়কে এটি গাড়ির গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চালক স্টিয়ারিং হুইল থেকে হাত সরিয়েও রাখতে পারবেন।

লেন পরিবর্তনের জন্য চালক দিকনির্দেশক লিভার ব্যবহার করতে পারবেন অথবা নিজেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে লেন পরিবর্তন করে আবার সহায়ক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে পারবেন। চালক নিজে গতি বাড়াতে বা কমাতে পারলেও ব্যবস্থাটি বন্ধ হয়ে যায় না। এমনকি ব্রেক চেপে গাড়ি সম্পূর্ণ থামানোর পর আবার ব্রেক থেকে পা সরালে গাড়িটি মসৃণভাবে চলতে শুরু করতে পারে।

গাড়িটিতে রয়েছে ১৭ দশমিক ৯ ইঞ্চির টাচক্রিন, যার মাধ্যমে বিনোদন ও তথ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী রেস্তোরাঁ খোঁজা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কাজ করতে পারে। তবে গাড়ির ভেতরে কেউ ‘বিএমডব্লিউ’ শব্দটি বললেই সহকারীর সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রবণতা কিছুটা বিরক্তিকর বলে পরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সামনের কাচজুড়ে তথ্য প্রদর্শন

কেন্দ্রীয় পর্দার ওপরে ড্যাশবোর্ডজুড়ে রয়েছে ‘প্যানোরামিক ভিশন’ নামের তথ্য প্রদর্শনব্যবস্থা। এতে ছয়টি অংশে আবহাওয়ার তথ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছবি দেখানোর সুবিধা রয়েছে। স্টিয়ারিং হুইলের পেছনের প্রচলিত যন্ত্রপাতির বদলে এই দীর্ঘ পর্দায় তথ্য দেখা তুলনামূলক সহজ বলে মনে হয়েছে পরীক্ষামূলক চালনায়।

তবে বাড়তি সুবিধা হিসেবে থাকা ১৪ দশমিক ৬ ইঞ্চির যাত্রীদের জন্য আলাদা পর্দাটি নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। পর্দাটি এমনভাবে বসানো হয়েছে, যাতে চালকের চোখে সরাসরি না পড়ে। গাড়ি চলার সময় চালক যদি ওই পর্দার দিকে তাকান, তাহলে গাড়ির ক্যামেরা তা শনাক্ত করে। এরপর নিরাপত্তার কারণে পর্দাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ভিডিও চলা থেমে যায়। চালক আবার সামনের দিকে মনোযোগ দিলে পর্দাটি চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে ভিডিও দেখতে হলে যাত্রীকে নিজে থেকেই তা চালু করতে হবে।

এক চার্জে ৭২৪ কিলোমিটারের বেশি চলার প্রত্যাশা

আইএক্স৫-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাটারির সক্ষমতা ও একবার চার্জে দীর্ঘ পথ চলার সুবিধা। গাড়িটিতে রয়েছে ১৪৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টা ধারণক্ষমতার ব্যাটারি। এনএসিএস সংযোগের মাধ্যমে এতে সর্বোচ্চ ৪৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতায় চার্জ দেওয়া যাবে। উপযুক্ত উচ্চক্ষমতার চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারির চার্জ ১০ থেকে ৮০ শতাংশে নিতে সময় লাগবে মাত্র ২২ মিনিট।

গাড়িটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার আনুষ্ঠানিক পাল্লা পরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে বিএমডব্লিউর প্রত্যাশা, একবার চার্জে এটি ৪৫০ মাইলের বেশি চলতে পারবে, যা প্রায় ৭২৪ কিলোমিটার। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলী সান ফ্রান্সিসকো থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত ৫০০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। যাত্রা শেষে গাড়িতে আরও প্রায় ৫০ মাইল চলার মতো চার্জ অবশিষ্ট ছিল।

পরীক্ষামূলক যাত্রায় জ্বালানিচালিত এক্স৫ এবং বৈদ্যুতিক আইএক্স৫-দুটি গাড়িই চালানো হয়েছে। পরীক্ষকের কাছে বৈদ্যুতিক সংস্করণটি বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। জ্বালানিচালিত গাড়িতে উচ্চগতিতে ভালো শক্তি পাওয়া গেলেও বৈদ্যুতিক মডেলটির ত্বরণ দ্রুততর। গাড়িটির ওজন বেশি হলেও নিচু কেন্দ্রীয় ভারসাম্যের কারণে বাঁক নেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ ও চালানোর অভিজ্ঞতা ভালো লেগেছে।

দামেও কাছাকাছি দুই সংস্করণ

নতুন প্রজন্মের এক্স৫ ও আইএক্স৫-এর নকশা এবং চালানোর অভিজ্ঞতায় আগের তুলনায় বেশি মিল রাখছে বিএমডব্লিউ। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, জ্বালানিচালিত ও বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে ক্রেতাদের কাছে বৈদ্যুতিক গাড়িকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্লাগ-ইন হাইব্রিড এক্স৫ ৫০ই মডেলের প্রারম্ভিক দাম ৭৭ হাজার ৫০০ ডলার। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক আইএক্স৫-এর দাম শুরু হচ্ছে ৭৯ হাজার ৮০০ ডলার থেকে। জ্বালানিচালিত এক্স৫-এও স্বয়ংক্রিয় দরজার সুবিধা পাওয়া যাবে, তবে এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।

দীর্ঘ পাল্লা, দ্রুত চার্জিং, স্বয়ংক্রিয় দরজা ও চালক-সহায়ক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আইএক্স৫ বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে এর নকশা এবং কিছু প্রযুক্তির ব্যবহারিক সুবিধা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সূত্র: এনগ্যাজেট

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/188454