মান্না ও সালওয়া আসলে কী?

মান্না ও সালওয়া আসলে কী?

মান্না ও সালওয়া হলো বনি ইসরাইলকে দেওয়া আল্লাহ তাআলার বিশেষ খাবার। ফেরাউনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে তারা যখন লোহিত সাগরের অপর পাড়ে পৌঁছে, আল্লাহ তাআলা তাদের আমালিকা গোত্রের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। তারা এই নির্দেশ অমান্য করে। এর ফলে আল্লাহ তাদের শাস্তি হিসাবে তিহ প্রান্তরে আটকে রাখেন। তারা সেখানে দীর্ঘ চল্লিশ বছর অবস্থান করে।

এই সময় তাদের সাথে থাকা খাদ্য-পানীয় শেষ হয়ে যায়। তারা তখন হজরত মুসার (আ.) কাছে দোয়া করতে আবদার করে। তিনি দোয়া করার পর আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেন। তাদের জন্য আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করেন। একই সঙ্গে পানির সংকট দূর করতে মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে একটি পাথরের ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করেন, সেখান থেকে বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হয়।

পবিত্র কোরআনে এই ঘটনা এভাবে এসেছে, ‘আর আমি তোমাদের ওপর মেঘের ছায়া দিয়েছিলাম এবং তোমাদের জন্য মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করেছিলাম। বলেছিলাম, “আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি, তা থেকে খাও।” তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করেনি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।’ (সুরা বাকারা: ৫৭)অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের বারোটি গোত্রে বিভক্ত করেছিলাম। আর মুসা যখন তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি চাইলেন, তখন আমি তার কাছে ওহি পাঠালাম, “তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করো।” ফলে তা থেকে বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হলো।

প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের পানি গ্রহণের স্থান চিনে নিল। আমি তাদের ওপর মেঘের ছায়া দিয়েছিলাম এবং তাদের জন্য মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করেছিলাম। বলেছিলাম, “আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি, তা থেকে খাও।” তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করেনি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।’ (সুরা আ‘রাফ: ১৬০)এই মান্না ও সালওয়া কী, এ ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। বাইবেলে বলা হয়েছে সালওয়া হলো কোয়েল পাখি, আর মান্না হলো শিশিরের মতো এক ধরনের খাদ্য।

‘যাত্রাপুস্তকে’ বলা হয়েছে:সন্ধ্যাবেলায় অনেক কোয়েল পাখি এসে শিবির ঢেকে ফেলল। সকালে শিবিরের চারপাশে শিশিরের আস্তরণ দেখা গেল। শিশির শুকিয়ে গেলে মরুভূমির মাটিতে তুষারের মতো পাতলা স্তর দেখা গেল। বনি ইসরাইল তা দেখে একে অন্যকে বলল, ‘এগুলো কী?’ কারণ, এ সম্পর্কে তারা জানত না। তখন মুসা তাদের বললেন, ‘এগুলো সেই রুটি, যা প্রভু তোমাদের খাওয়ার জন্য দিয়েছেন।’ (এগজোডাস, ১৬: ১৩-১৫)তাফসিরে ইবনে কাসিরে মান্না ও সালওয়া সম্পর্কে সাহাবি ও তাবেয়িদের একাধিক মত উল্লেখ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) মতে মান্না গাছপালার ওপর নাজিল হতো। সকালে বনি ইসরাইল সেখান থেকে নিজেদের পছন্দমতো খেত। প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদের (রহ.) মতে, মান্না ছিল এক ধরনের আঠা। ইকরিমা (রহ.) একে শিশিরের মতো ঘন শিরার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

কাতাদাহ (রহ.) বলেন, মান্না তুষারপাতের মতো ঝরে পড়ত। এটি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি ছিল। রবি ইবনে আনাসের (রহ.) মতে, মান্না ছিল মধুর মতো একধরনের পানীয়, যা পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা হতো। ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহের (রহ.) মতে, মান্না ছিল পাতলা রুটির মতো।অন্যদিকে সালওয়া সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এটি ছিল কোয়েল পাখির মতো একধরনের পাখি। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, এই পাখিগুলো দক্ষিণা বাতাসে ভেসে তাদের কাছে আসত।

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহের (রহ.) মতে, সালওয়া ছিল কবুতরের মতো মোটা-সোটা পাখি।কিন্তু বনি ইসরাইলের কাছে এই খাবার ভালো লাগত না। তারা উলটো অভিযোগ করে যে, প্রতিদিন একই ধরনের খাবার খেতে খেতে তারা বিরক্ত ! কোরআনে এই প্রসঙ্গ এভাবে এসেছে, ‘আর যখন তোমরা বলেছিলে, হে মুসা, আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য ধারণ করব না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করো, যেন তিনি আমাদের জন্য ভূমিজাত দ্রব্য শাক-সবজি, কাঁকড়, গম, মসুর ডাল ও পেয়াজ উৎপাদন করেন।’ (সুরা বাকারা: ৬১)অথচ আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গিয়ে তাদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি করেছিলেন। তাদের জন্য ভূমিও নির্ধারণ করেন।

কেবল তাদের নির্দেশ করেছিলেন নিজেরা যেন যুদ্ধ করে সেই ভূমি উদ্ধার করে। কিন্তু তারা এতটুকু কাজ করতেও অস্বীকৃতি জানায়। এর শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাদের তিহ প্রান্তরে চল্লিশ বছরের জন্য আটকে রাখলেন। সেখানেও তাদের মৃত্যুর মুখের ছেড়ে দেননি। আসমান থেকে তাদের খাবারের বন্দোবস্ত করলেন, অলৌকিকভাবে পাথর থেকে পানি বের করলেন।

এরপরও তারা নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করার পরিবর্তে অভিযোগ করে যে, একই খাবার খেতে খেতে আমরা বিরক্ত ! তারা যেন ভুলেই গিয়েছিল, তাদের এই দুর্দশা নিজেদের অবাধ্যতারই পরিণতি। শাস্তির মধ্যেও আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়ে তারা ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/188378