বগুড়ার ধুনটে ঐতিহ্যবাহী শারদীয় বউমেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন
ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি : চারদিকে নারী আর নারী। কারও হাতে রঙিন চুড়ি, কারও চোখ বাহারি অলংকারে, কোথাও চলছে দর-দাম, কোথাও হাসি-আড্ডায় মাতোয়ারা একদল নারী। পুরুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই, অথচ কেনাবেচা থেকে আনন্দ-উৎসব সবকিছুর প্রাণ তারাই। ইছামতীর তীরে বছরে এক দিনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের নাম ‘বউমেলা’। শত বছরের ঐতিহ্যে ভর করে শারদীয় দূর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে বসা এ মেলা যেন নারীদের একান্ত আপন ভুবন।
আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) বগুড়ার ধুনট পৌর এলাকার সরকারপাড়া ইছামতি নদীর তীরে বসে দিনব্যাপী এ মেলা। শাশুড়ি, ননদ, জা-ঝি থেকে শিশু-কিশোরী সব বয়সী নারীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সবুজ-শ্যামল চত্বর। কাঁচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল ও ঝিনুকের মালাসহ নানা প্রসাধনীর পশরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা।
পছন্দের জিনিস কেনার ধুমের সঙ্গে চলে দরদাম আর খুনসুটি। কদমা, নিমকি, শখের মিঠাই, চানাচুর, খই ও বাতাসাসহ হরেক রকম খাবারের ঘ্রাণে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ। মেলার অন্যতম আকর্ষণ মাটির তৈরি বাহারি খেলনা। কুমারদের নিপুণ হাতে গড়া রঙিন ব্যাংক, বউ পুতুল, সাহেব-মেম, গরু, ছাগল, হাতি, বাঘ, সিংহ, ময়ূর ও নানা পাখির প্রতিকৃতি তুলে ধরে গ্রামবাংলার চিরচেনা শিল্প-ঐতিহ্য।
স্থানীয়রা জানান, যুগ-যুগান্তের পুরোনো এই মেলার ঐতিহ্য রয়েছে। প্রতি বছর বিজয়া দশমীতে আয়োজিত হয় বউমেলা। শুরুতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় বউমেলা এখন সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা পরিসর তৈরির ভাবনা থেকেই এ মেলার সূচনা। তাই সারা বছর দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন অনেকে।
মেলায় এসেছেন অনিতা রানী দাস। তিনি বলেন, পুরানো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন সরকারপাড়া বউমেলাটি। আমি আসি ঐতিহ্যের গরম জেলাপি নিতে। এছাড়া এই একটি দিন নিজেদের মতো করে ঘোরাফেরা, কেনাকাটা ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগ মেলে।
সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও অনেকে ঘুরতে এসেছেন একদিনের এই মেলায়। বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন মিল্লাত হোসেন। তিনি বলেন, পুরনো স্মৃতির পটভূমিতে নতুন করে আঁচড় কাটে মেলাটি। তাই বছর ঘুরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। বৈশাখ আর পূজা ছাড়া এমন আমেজ তো পাওয়া যায় না।
মেলা আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক পার্থ সেন বলেন, গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে এ মেলার আয়োজন করে আসছেন। দিনভর উৎসবের পর সন্ধ্যায় ইছামতি নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় মেলা। ইছামতীর তীরে বউমেলা তাই শুধু কেনাবেচার আয়োজন নয়, এটি নারীর নিজস্ব পরিসর, লোকজ সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/188220