পাখির ছানা ধরতে মানা
পাখির প্রতি অপুর ছিল অগাধ ভালোবাসা। দিন নেই, রাত নেই—গাছে গাছে, রোদে-ভরদুপুরে ঘুরে বেড়াত সে। কোথায় কোন পাখি বাসা বেঁধেছে, কোথায় ছানা ফুটেছে—এসব খবর যেন অপুর নখদর্পণে। আট বছরের অপু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল ছুটি হলেই বই-খাতা টেবিলে রেখে ভোঁদৌড়ে ছুটে যেত এদিক-ওদিক। কখনো স্কুলের পোশাক পরেই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত। পাখির ছানা ধরতে গিয়ে কত প্যান্ট-লুঙ্গি যে ছিঁড়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। প্রায় রাতেই মায়ের হাতে বকুনি খেত, কখনো দু-এক ঘা মারও জুটত।
কিন্তু সকাল হলেই আবার সেই অপু—পাখির ছানার খোঁজে ছুটে বেড়াত। একদিন বাবার কাছে বায়না ধরল, “বাবা, আমার জন্য একটা পাখির খাঁচা বানিয়ে দাও। না হলে বাজার থেকে কিনে দাও। খাঁচা না দিলে আমি স্কুলে যাব না, ভাতও খাব না!” বাবা-মা, দাদু, বোন—সবাই মিলে কত বোঝাল তাকে। মা বললেন, “বাবা, পাখির বাসায় হাত দিতে নেই। অনেক সময় বাসার আশপাশে বিষধর সাপ থাকে। তাছাড়া তুমি যেমন তোমার বাবা-মাকে ছাড়া থাকতে পারো না, পাখির ছানাগুলোও তো তাদের মা-বাবাকে ছাড়া থাকতে পারে না।” বাবা আদর করে বললেন, “এসব আর করো না বাবা।
তোমাকে কবুতর কিনে দেব। নিজের হাতে যত্ন করে পুষবে।” কিন্তু কে শোনে কার কথা! বাঁশঝাড়ে বকের ছানা, গাছের ডালে শালিকের ছানা কিংবা গাছের গর্তে টিয়াপাখির ছানা—যেখানেই কোনো ছানার খবর পেত, অপু সেখানেই হাজির। পাখির ছানা ধরার নেশায় ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করত না। রোদে পুড়ে শুকনো কাঠের মতো হয়ে যাচ্ছিল শরীরটা। কোনো ছানা হাতে পেলেই শুরু হতো তার নতুন কান্ড। ছানাটি তো নিজে ভাত খেতে পারে না। অপু জোর করে তার মুখ হাঁ করিয়ে ভাত ঢুকিয়ে দিত। তারপর পানি দিয়ে গলার ভেতর খাবার নামানোর চেষ্টা করত। ছানাগুলো ভয়ে কিচিরমিচির করে চিৎকার করত। মা পাখি দূর থেকে এসে অপুর মাথার ওপর চক্কর দিয়ে ঠোকর মারতে চাইত। আর অপু ছানা হাতে নিয়ে দৌড়!
অপুর এই কান্ডে মা-বাবার চিন্তার শেষ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মা স্কুলের শিক্ষকের কাছেও নালিশ করলেন। শিক্ষকও তাকে বুঝিয়ে বললেন, পাখির ছানা ধরা ঠিক নয়। কিন্তু অপুর মনে তখন একটাই কথা—পাখির ছানা সে পুষবেই। একদিন খবর পেল, পাশের জঙ্গলের একটি কড়ই গাছে নাকি কোকিল বাসা বেঁধেছে, ছানাও ফুটেছে। খবরটা শুনেই অপুর চোখ চকচক করে উঠল। তবে বাসাটি ছিল কাকের। কিন্তু অপু তা জানত না। আজ সে কোকিলের ছানা ধরবেই! দুপুরের দিকে বৃষ্টি থেমে ঝলমলে রোদ উঠল। কিছুক্ষণ পর আবার আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। কিন্তু অপু কোন কিছুর তোয়াক্কা করল না। ছুটল জঙ্গলের দিকে। কড়ই গাছটির পাতায় তখনও বৃষ্টির পানি জমে ছিল। গাছের কাছে গিয়ে অপু ভালো করে তাকিয়ে দেখল—বাসার ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে।
অপুর আর তর সইল না। ধীরে ধীরে গাছে উঠতে শুরু করল। যত ওপরে উঠছে, ততই তার আনন্দ বাড়ছে। মনে মনে ভাবছে কোকিলের ছানাটাকে সে পুষবে। ছানাটি বড় হয়ে তাকে অপু বলে ডাকবে। অপুর সাথে স্কুলে যাবে। নাম রাখবে “পটু!” আর মাত্র একটু ওপরে উঠলেই বাসা। হাত বাড়িয়ে বাসাটি ধরতে যাবে ঠিক তখনই ফসসস!
বাসার ভেতর থেকে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে গেল কালো কুচকুচে এক বিষধর সাপ। সাপটি ফণা তুলে ফুঁসছে। অপুর চোখ যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে গেল। ভয়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। চোখের সামনে ফণা তোলা সাপ। তাড়াহুড়ো করে নিচে নামতে গিয়ে পা পিছলে গেল। ধপাস! গাছ থেকে ছিটকে পড়ে পাতার স্তূপের ওপর আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারাল সে। কাছাকাছি থাকা এক ছেলে ঘটনাটি দেখে দৌড়ে অপুর বাড়িতে খবর দিল। লোকজন ছুটে এসে অপুকে বাড়ি নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরল তার।
চোখ মেলেই দেখল—মা পাশে বসে কাঁদছেন। গাছ থেকে পড়ে অপুর বাঁ হাত মচকে গেছে। শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা। ভাগ্য ভালো, নিচে শুকনো পাতার স্তূপ ছিল; না হলে কী যে হতো। কিন্তু অপুর সবচেয়ে বড় ভয় তখনও কাটেনি। চোখ বন্ধ করলেই ফণা তোলা কালো সাপ, আর ফুঁসতে ফুঁসতে তার দিকে তাকিয়ে থাকা। সেদিন রাতে অপুর প্রচণ্ড জ্বর এলো। সেই জ্বরে টানা এক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে রইল সে।
ছেলের এই অবস্থা দেখে বাবা বললেন,তুমি ভালো হয়ে ওঠো। হাটে গিয়ে তোমার জন্য সুন্দর দুটো কবুতর নিয়ে আসব। তুমি নিজের হাতে ওদের যত্ন করবে। কিন্তু আর কখনো পাখির ছানা ধরতে যেও না, বাবা। পাখিরও তো একটা ঘর আছে, মা আছে, বাবা আছে। অপু চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বারবার ভেসে উঠছিল সেই ফণা তোলা সাপটা। এই প্রথমবারের মতো অপুর মনে হলো— পাখিকে ভালোবাসা মানে তাকে নিজের খাঁচায় বন্দী করা নয়; বরং তার আকাশটাকে মুক্ত থাকতে দেওয়া।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/187623