চিকিৎসা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব

চিকিৎসা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশই যেন ঘোলাটে হয়ে উঠছে। 'জল ঘোলা করে মাছ শিকার' একটি কূটকৌশল হিসেবে স্বীকৃত এবং আমরা সম্ভবত: তারই বাস্তবতা দেখছি। সবার মনোজগতে এখন 'ডিসেম্বর', প্রত্যার্পণ নাকি প্রত্যাবর্তন? অনেক বিশ্লেষণ হচ্ছে উভয় পক্ষেই। আমজনতা কেবল শুনছে আর ভাবছে কাঁচের ঘরে বসে অন্যকে ঢিল ছোঁড়ার পরিণতি কি হতে পারে? বৈদেশিক শক্তির উপর নির্ভর করে দেশের মানুষের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি সম্ভব? অসুস্থ রাজনীতির চিকিৎসা ঠিকমত না হলে তার ভাইরাস সমাজে ছড়িয়ে পড়বে, জানমালের ক্ষতি হবে ব্যাপক। 

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সমস্যার কোন শেষ নেই। নুন আনতে যাঁদের পান্তা ফুরায় তারা প্রতিদিন পার করছেন খুবই নিদারুণভাবে। বাজারে পণ্যের দামে লাগাম নেই, আছে শুধু কথার ফুলঝুড়ি। টাকার অভাব একদিকে যখন দেশের অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে অপরদিকে তখন আমাদের চলছে বিমান কেনা, সামরিক সরঞ্জাম কেনার হিড়িক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে তার সাথে মূল্য সমন্বয় প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও করা হলো না। শিক্ষার আলোয় অপশক্তির অন্ধকার দূর হবে সেটাও যেন দুরাশা! তাহলে কী আমাদের ভবিষ্যৎ? আমরা সবাই জানি, বিশ্ব দুইভাগে বিভক্ত। একদল শোষণ করছে আর অন্যদল শোষিত হচ্ছে। পৃথিবীর প্রায় ১ শতাংশ মানুষের হাতে ৮০% সম্পদ এখনও কুদ্ধিগত। এবাই উৎপাদন যন্ত্রের মালিক, এরাই প্রশাসনের প্রধান এবং সকল শক্তি এদের নিয়ন্ত্রণে। অপরদিকে থাকা ৯৯% মানুষ কোনরকমে নিজের টিকে থাকা, পরিবারের সম্মান বাঁচাতে মরিয়া। বৈষম্যের অবসান করার ঘোষণা যতই দেয়া হয়ে থাকুক, বৈষম্য বিরাজমান এবং তা বাড়ছে। কারণ ক্ষমতার মসনদে ব্যক্তির বদল হলেও ব্যবস্থার কোন বদল হয়নি।

পুঁজির মালিকেরা সর্বময় ক্ষমতায়! দেশ ও সমাজটা সকলের। সেখানে সবার জন্য সুযোগ সমান। উদ্বৃত্ত মূল্যে থাকবে শ্রমিকের অধিকার, কৃষকের ঘরে থাকবে না খাদ্যের অভাব এমনি এক স্বপ্ন নিয়ে দুনিয়াতে ঘটেছিল এক বিপ্লব, যাকে সবাই জানে 'মহান অক্টোবর বিপ্লব' হিসেবে। এ বছর এই বিপ্লবের ১০৯তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। রাশিয়ায় শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বে ১৯১৭সালে সংঘটিত এই মহান বিপ্লব বিশ্বের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় আজও এক গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। বৈষম্যের দাবী এখন প্রতিটি সাধারণ ও শোষিত-বঞ্চিতদের হৃদয়ে। কিন্তু বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লড়াইটা বিশ্বের বহুদেশেই এখনও দূর্বল। শোষিত-বঞ্চিত মানুষেরা সংগঠিত না হলে নতুন বিশ্ব গড়া যাবে না। মহান অক্টোবর বিপ্লবের এই মাসটি আমার কাছে খুবই অনুপ্রেরণার। এই মাসে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলাদেশের ইলা মিত্র (১৮ অক্টোবর, ১৯২৫), তাঁর মৃত্যু তারিখও অক্টোবর ১৩, ২০২২। 

অক্টোবর মাসেরই ৯ ই ৯ তারিখ স্মৃতিময় কারণ ঐদিন মৃত্যুবরণ করেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার প্রগতিশীল বিপ্লবী চে গুয়েভার (১৯৬৭) এবং বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ এর মৃত্যুবার্ষিকী। অক্টোবর ৯, ২০১২ তারিখে পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনের অসীম  সাহসী নারী মালালা ইউসুফজাই এর উপর বর্বোরোচিত হামলা হয়েছিল। প্রত্যেকটি ঘটনা আলাদাভাবেই তাৎপর্যময়। যদিও এদের মধ্যে মূল চেতনার ঐক্যসূত্রটি হলো 'মুক্তি'। চে গুয়েভার, ইলা মিত্র, মোহাম্মদ ফরহাদ থেকে মালালা সবাই চেয়েছিলেন সাধারণের মুক্তি। যদিও সেই মুক্তি আসেনি, সেই বৈষম্যের অবসান এখনও হয়নি। আরও পথ হাঁটতে হবে। হয়তো এই বঞ্চনার দিন ঘুচবেই একদিন। 

আমরা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি, 'নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তাঁর ক্ষয় নাই'। চে'র একটি উক্তি Let's be realistic, demand impossible" আমার অসম্ভব প্রিয়। বাংলা করলে কথাটা দাঁড়ায়, 'বাস্তববাদী হও, অসম্ভবের দাবী জানাও'। চে গুয়েভার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য ও শোষণ অবসানে বিশ্বাসী ছিলেন। লুটেরা পুঁজি'র কবর রচনা করে সাম্য ও শোষণহীন এক সমাজ গড়ার চিন্তা সে সময়েও অনেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব ছিল। যেমন এখনও আমরা অনেকেই মনে করি বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন অসম্ভব। এটা সত্য যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে চট করে দূরের ভবিষ্যত দেখা সম্ভব হয় না। কিন্তু চে' গুয়েভার বা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বা মালালা ইউসুফজাই এর মত মানুষেরা অসম্ভবের দেয়ালে আটকে না থেকে সেই 'দেয়াল' ভেঙ্গে ফেলার মত অসম্ভবের পথেই হেঁটেছেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, বর্তমানের যে বাস্তবতা তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু কেবল বাস্তবতার মধ্যে গুটিশুটি মেরে বসে থাকলে কোনদিনই 'নতুন ভবিষ্যত' তৈরী করা যাবে না। 'অসম্ভবকে চাইতে হবে'। সাহসের সাথে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষাকে বাহনে পরিণত করতে হবে।

অস্ত্রের বদলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবীতে অনড় থাকতে হবে। কোটি কন্ঠের মিলিত আওয়াজ একদিন না একদিন অবশ্যই আমেরিকার 'সাদাবাড়ি'তে শুয়ে থাকা কুম্ভের কানে পৌঁছাবে। নিজেদের অধিকার নিজেদেরই আদায় করতে হবে। মোহাম্মদ ফরহাদ বা ইলা মিত্র যে শোষণ, বৈষম্যহীন ও সাম্যের আদর্শের পতাকা তুলে ধরেছেন, নতুন প্রজনকে সেই পতাকা সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে হবে। দিন বদলাতেই হবে। বিপ্লবী চে গুয়েভার মানুষের চিকিৎসা করার স্বপ্ন নিয়ে একদিন মেডিকেল কলেজে এসেছিলেন কিন্তু সমাজের বিরাজমান অসাম্য, অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, শুধু দেহের চিকিৎসা নয়, সমাজের চিকিৎসা করতে হবে। সরকার কাঠমোর রুন্ত্রে রুন্দ্রে যে বিষাক্ত জীবাণু ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে আছে তার চিকিৎসা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/187072