সিরাজগঞ্জে বজ্রপাত রোধে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন আবুল কালাম আজাদ

সিরাজগঞ্জে বজ্রপাত রোধে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন আবুল কালাম আজাদ

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি: বজ্রপাত রোধে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন সিরাজগঞ্জ শহরের সয়াধানগড়া মধ্যপাড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ। তালগাছ লাগানোর শুরুটা হয়েছিল ২০০২ সালের একটি বজ্রপাতের ঘটনা থেকে।

সেদিন কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামের মামার বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন আবুল কালাম। দুপুরে সেখানে ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন আত্মীয়-স্বজন। হঠাৎ বৃষ্টির সাথে শুরু হয় বিকট শব্দে একের পর এক বজ্রপাত।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, হঠাৎ করে একটি বজ্রপাত তার চোখের সামনে পড়ে। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়ি। বজ্রপাতটি বাড়ির উঠানে থাকা উঁচু একটি তালগাছের মাথায় পড়ে। চোখের পলকে চিরে ছিন্নভিন্ন করে দেয় গাছটি।

তিনি বলেন, তালগাছটি যেন বুক পেতে সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। গাছটি পুড়ে গেলেও বাড়িতে থাকা কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। পরে লোকজন বলাবলি করছিলেন, তালগাছ অনেক উঁচু হওয়ায় বজ্রপাতকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং মাটিতে নামিয়ে আনে।

ফলে আশপাশে থাকা মানুষ ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয় না। এসব শুনেই তার মনে হয়েছিল, প্রায়ই তো বজ্রপাতে মানুষ মারা যায়। মাঠে-ঘাটে আরও তালগাছ থাকলে নিশ্চয়ই এমনটা হতো না। পরে এই কৌতূহল থেকেই তালগাছের প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। এবং বিভিন্ন এলাকায় তল বীজ বপণ শুরু করেন।  তার হাতে এপর্যন্ত  হয়েছে সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ বপণ।

পেশায় দর্জি আবুল কালাম আজাদ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘তালগাছ প্রেমী’ হিসেবে পরিচিত। শুধু তাল বীজ বপণ করেই থেমে থাকেননি তিনি। নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যাও করেন। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, ঘোর বর্ষা কিংবা তীব্র শীত- প্রায় প্রতিদিনই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে পড়েন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক কিংবা বাঁধের পাশে নিজের লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যা করেন।

তিনি এ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালি, ইলিয়ট ব্রিজ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহররক্ষা ক্রসবার-৩ ও ৪ নম্বর বাঁধ, সিরাজগঞ্জ শহর-কাজীপুর সড়ক, সদর উপজেলার কালিয়াহরিপুর, বহুলী ও শিয়ালকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ বপণ করেছেন।

একইসঙ্গে এসব এলাকার সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুই হাজার খেজুর গাছের বীজও বপণ করেছেন। প্রথম দিকে আবুল কালামের পরিবারের লোকজন তার ওপর বিরক্ত হতেন। এখন তারাও সহযোগিতা করছেন। নিজ মহল্লার প্রতিবেশীরাও শুরুতে তার এই কাজ ভালোভাবে নেননি।

তবে এখন তাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। বাঁধের পাশের বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, আবুল কালামের মতো নিঃস্বার্থ মানুষ হয় না। পরিবারের আপত্তি কিংবা স্থানীয়দের উৎপাত কোনো কিছুই তাকে তালগাছ লাগানোর পাগলামি দমন করতে পারেনি। নিজের জায়গা নেই, তবুও রাস্তার পাশের সরকারি জায়গায় তালগাছ রোপণ করেন তিনি।

এ কারণে এলাকার মানুষ তাকে তালগাছ প্রেমী হিসেবেই চেনেন। তার এই অবদানকে একটি ভালো উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) মামুন খান বলেন, তালগাছের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত উপকারিতা অপরিসীম। এ উপজেলায় দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি তালগাছ লাগিয়ে আসছেন, এটি নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। তিনি কোনো সহযোগিতা চাইলে আমরা অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াব।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186804