বাছুর ছানার ভালোবাসা
এক কৃষকের বাড়িতে একটি গাভী আর তার ছোট্ট বাছুর থাকত। বাছুরটির নাম বাহাদুর। সে সারাক্ষণ মায়ের পেছনে পেছনে ঘুরত। মা একটু দূরে গেলেই হাম্বা হাম্বা করে ডাকত। মা কাছে এলে তার গা ঘেঁষে দাঁড়াত। কৃষকটি ছিল খুব নিষ্ঠুর। সে প্রতিদিন গাভীটিকে দিয়ে মাঠে কাজ করাত। অথচ কাজ শেষে পেট ভরে খেতে দিত না। গাভীর দুধ দোহন করে বাজারে বিক্রি করত, কিন্তু গাভীটির খাবারের দিকে তার তেমন খেয়াল ছিল না। রাতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখত, যাতে কোথাও যেতে না পারে। মায়ের এমন কষ্ট দেখে বাহাদুরের খুব মন খারাপ হতো।
সে মায়ের কাছে গিয়ে গা ঘষত, কখনো মুখ দিয়ে মায়ের গাল ঠেলে দিত। গাভীটি ছেলের মাথায় মুখ বুলিয়ে দিত। মায়ের কাছে থাকতে পারলেই বাহাদুরের ভালো লাগত। একদিন দুপুরে কৃষক তার ভুট্টাখেত থেকে অনেক ভুট্টা তুলে মাঠের কিনারায় শুকাতে দিল। বাহাদুর দূর থেকে সব দেখছিল। কৃষক চলে যাওয়ার পর সে আস্তে আস্তে ভুট্টার স্তূপের কাছে গেল। একটা ভুট্টা মুখে নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে এল। গাভীটি তখন দড়িতে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাহাদুর ভুট্টাটি মায়ের মুখের সামনে ধরল। গাভীটি প্রথমে ছেলের দিকে তাকাল, তারপর ভুট্টা খেতে শুরু করল।
মা খাচ্ছে দেখে বাহাদুর আবার দৌড়ে গেল। আরেকটি ভুট্টা নিয়ে এল। এভাবে কয়েকবার যাতায়াত করল সে। ছোট্ট মুখে ভুট্টা টেনে আনতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তবু সে থামল না। একবার ভুট্টা নিয়ে আসার সময় কৃষককে দূর থেকে আসতে দেখে বাহাদুর ভয়ে গাছের আড়ালে লুকাল। কৃষক চলে গেলে আবার বেরিয়ে এল। তারপর ভুট্টা নিয়ে মায়ের কাছে গেল। গাভীটি ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আদর করে তার মাথায় নাক ঘষে দিল। বাহাদুর লেজ নেড়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। এভাবেই চলছিল তাদের দিন। সুযোগ পেলেই বাহাদুর মায়ের জন্য ভুট্টা নিয়ে আসত। নিজের ক্ষুধা লাগলেও আগে মাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করত। একদিন বিকেলে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। বাতাসে গাছের ডালপালা নড়ছিল। কৃষক তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গেল। যাওয়ার আগে গাভীটিকে বেঁধে রাখল ঠিকই, কিন্তু দড়ির গিঁটটি ভালো করে বাঁধতে ভুলে গেল। বাহাদুর মায়ের কাছে এসে দড়িটা কামড়ে টানতে লাগল।
একটু পরেই গিঁট খুলে গেল। গাভীটি মুক্ত হলো। সে ছেলের দিকে তাকাল। বাহাদুর মায়ের পাশে ঘুরতে ঘুরতে গ্রামের পথের দিকে এগিয়ে গেল। গাভীটিও তার পেছনে হাঁটতে শুরু করল। তারা মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরে চলে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে এল। অবশেষে একটি সবুজ অরণ্যের কাছে পৌঁছাল তারা। সেখানে অনেক গাছ, চারদিকে ঘাস আর পাশে ছোট্ট একটি ঝরনা। বাহাদুর ঘাসের ওপর ছুটোছুটি করতে লাগল। কত দিন পর সে এভাবে দৌড়ানোর সুযোগ পেল! কখনো গাছের কাছে যায়, কখনো আবার মায়ের কাছে ফিরে আসে। গাভীটি নিশ্চিন্তে ঘাস খেতে লাগল। বাহাদুরও মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ঘাস খেল। তারপর দুজন ঝরনার পানি পান করল। রাত হলে তারা একটি বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিল। বাহাদুর মায়ের গায়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। গাভীটি ছেলের গায়ে মুখ বুলিয়ে দিল। সারাদিনের ক্লান্তিতে বাহাদুরের চোখ বুজে এল। মা পাশে থাকায় তার আর কোনো ভয় রইল না। পরদিন সকালে পাখির ডাকে বাহাদুরের ঘুম ভাঙল। সে উঠে মায়ের মুখের কাছে গিয়ে ডাকল।
গাভীটি তার গা চেটে দিল। তারপর দুজন ঘাস খেতে বেরিয়ে পড়ল। এরপর থেকে অরণ্যেই তাদের দিন কাটতে লাগল। বাহাদুর মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত, ঝরনার ধারে খেলত, আবার ক্ষুধা পেলে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াত। মা গাভীটিও তাকে চোখের আড়াল হতে দিত না। একদিন বিকেলে বাহাদুর ঘাস খেতে খেতে মায়ের কাছ থেকে একটু দূরে চলে গিয়েছিল। হঠাৎ ঝোপের ভেতর থেকে একটা শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে মায়ের কাছে ফিরে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মা তাকে আদর করে কাছে টেনে নিল। বাহাদুরও মাথাটা মায়ের গায়ে ঠেকিয়ে রইল। সেই দৃশ্য দেখে মনে হতো, মায়ের কাছে থাকাই বাহাদুরের সবচেয়ে বড় সুখ। একসময় যে ছোট্ট বাছুর নিজের মুখে ভুট্টা এনে মাকে খাওয়াত, আজও সে মাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। অরণ্যের সেই ছোট্ট সংসারে তাদের দিন ভালোই কাটছিল। সেখানে দামি খাবার ছিল না, বড় কোনো ঘরও ছিল না। ছিল শুধু খোলা মাঠ, সবুজ ঘাস আর মায়ের সঙ্গে নিশ্চিন্তে থাকার আনন্দ।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186767