দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা
দুই দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এখন বড় প্রশ্ন-দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠা মানুষগুলো কি সত্যিই অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ? সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, অনেক পরিবার সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই আবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনের পুরোনো সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি এখন প্রয়োজন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশল।
কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের বিস্তার, নারীর কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি, আয়হ্রাস ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতার কারণে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; ২০২৬ সালে তা ২০ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে-এটি অবশ্য পূর্বাভাস, চূড়ান্ত হিসাব নয়। শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, আয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মূল্যস্ফীতি। দ্রব্যমূল্য বাড়লেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয় একই হারে বাড়েনি। ফলে কমেছে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম মজুরি, অনিয়মিত কাজ, দুর্বল বিনিয়োগ, আয়-বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের মানের অবনতি। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ কম মজুরির কাজে নিয়োজিত। তাই সমস্যা শুধু 'কাজ নেই'-এমন নয়; অনেকের সমস্যা হলো যে কাজ আছে, তা দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন। এখানেই দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন চ্যালেঞ্জ। মানুষকে শুধু সহায়তা দিলে হবে না, এমন আয় সৃষ্টি করতে হবে যাতে তারা নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে পারে।
জ্বালানি ব্যয় ও শিল্পের চাপ সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটার। এতে পরিবহন, কৃষি, সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপরই পড়ে। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ৪১৩টি কারখানা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ১৮টি উৎপাদন ইউনিট কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। এর প্রভাব পড়ে শ্রমিকের আয় ও কর্মসংস্থানে। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের নীতি শুধু দরিদ্রদের সহায়তায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিল্প সচল রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে দারিদ্র্য বিমোচনের কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।
চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার অর্থনৈতিক মূল্য দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনায় আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মব-সহিংসতা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, চাঁদাবাজি, দখল ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি মানুষের নিরাপত্তাবোধের পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থাকেও দুর্বল করে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে মব-সম্পর্কিত ১৩২টি ঘটনায় অন্তত ৭১ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবসার ব্যয় বাড়ায়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং উদ্যোক্তার ঝুঁকি বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা ভোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের ওপরও পড়ে। অতএব এগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এগুলো সরাসরি অর্থনৈতিক সমস্যা। কারণ অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগ কমে, বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে, কর্মসংস্থান কমলে মানুষের আয় কমে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থনীতির এই চক্র ভাঙতে হলে নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
অতি দরিদ্ররাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে : সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় অতি দরিদ্র মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। যাদের সঞ্চয় নেই, সম্পদ নেই এবং আয় অনিশ্চিত-অসুস্থতা, কর্মহীনতা, দ্রব্যমূল্যের চাপ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামান্য ধাক্কাতেই তারা আবার চরম দারিদ্র্যে ফিরে যেতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠা মানেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়। তাই শুধু কতজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠল, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; দেখতে হবে কতজন মানুষ স্থায়ী আয়, সম্পদ ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করল। সামাজিক নিরাপত্তার লক্ষ্য হোক স্বাবলম্বিতা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে এই সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি সহায়তাকে উৎপাদনশীল কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত করাও প্রয়োজন। অতি দরিদ্র মানুষের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র পুঁজি, উৎপাদনশীল সম্পদ, কৃষি, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা শুধু নির্ভরশীলতা কমাবে না, বরং স্বাবলম্বিতার পথও তৈরি করবে। ভাতা প্রয়োজন, কিন্তু ভাতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা নয়-মানুষকে আয় করার সক্ষমতা দেওয়াই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।
বাংলাদেশের সামনে দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা, শিল্প সচল রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ-এসবকে বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা কমলে ব্যবসায়িক আস্থা বাড়বে; আস্থা বাড়লে বিনিয়োগ বাড়বে; বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে; আর কর্মসংস্থান ও আয় বাড়লেই দারিদ্র্য টেকসইভাবে কমবে। দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠল-তা নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো কতজন মানুষ এমন স্থায়ী আয়, সম্পদ ও সক্ষমতা অর্জন করল, যাতে সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কাতেও তাকে আবার দারিদ্র্যে ফিরে যেতে না হয়। ভাতা দিয়ে মানুষকে টিকিয়ে রাখা নয়, আয় ও সক্ষমতা দিয়ে মানুষকে স্বাবলম্বী করাই হতে হবে বাংলাদেশের নতুন দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল।
লেখক: সাবেক ব্যাংকার
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186599