বগুড়ায় জাল টাকার কারবার অধরা গডফাদার, গ্রেফতার হচ্ছে শুধু বাহক
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় ফের তৎপর হয়ে উঠেছে জাল টাকার কারবারি চক্র। শহর-বন্দর-উপজেলায় জাল টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছে এই চক্র। ৩-৪ হাত বদলের মাধ্যমে জাল টাকার কারবার চলে। জালটাকা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। তবে চক্রের বাহকরা ধরা পড়লেও গ্রেফতার হচ্ছে না পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদার।
সিআইডি বগুড়ার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোতাহার হোসেন আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বলেন, গ্রেফতারের পর বাহকরা তাদের গডফাদারদের নাম প্রকাশ করেনা। নাম প্রকাশ করলে বিপদ হতে পারে এই ভয়ে তারা মুখ খোলেনা। শুধু বলে তারা জালটাকার বাহক মাত্র। তাদের গডফাদারকে চেনেনা তারা। এজন্য জালটাকার মামলার তদন্ত আর তেমন এগোয়না। যে কারনে গডফাদারের নাগাল পায়না পুলিশ।
পুলিশ সুপার আরো বলেন,যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অবিকল আসল নোটের মত জালনোট তৈরি করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, জালনোট সংক্রান্ত একাধিক মামলা সিআইডি তদন্ত করছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান বলেন, সমাজে জালটাকার বিস্তার বেড়ে গেছে। যখন আমরা কাউকে ধরছি তারা বাহক বা ব্যবহারকারী মাত্র। কিন্তু মেইন কারিগর, যারা জালটাকা তৈরি করছে সেই মূল হোতাদের গ্রেফতার করতে পারছিনা এটা সত্য। কারন বাহকরা তাদের গডফাদারের নাম বলতে চায়না।
রিমান্ডে এনেও তাদের কাছ থেকে গড ফাদার সম্পর্কে তথ্য মেলেনা। যে কারনে চক্রের মুল হোতা বা গড ফাদারকে গ্রেফতার করা যায়না। তিনি বলেন, তিন-চার হাত বদল করে জাল টাকার কারবার চলে। এমন তথ্য দিয়েছে বগুড়ায় গ্রেফতার হওয়া একাধিক বাহক।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, শুধু বগুড়া নয়, সারাদেশেই এই চক্রের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। দুর্গা পুজা সামনে রেখে জালটাকা কারবারি চক্রের তৎপরতা বেড়েছে। এদিকে শুধু জালটাকা কেনা-বেচাই নয়, জালটাকা দিয়ে প্রতারণাও করা হচ্ছে। গতকাল ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়া মহানগরের মেরিনা রোডের আনোয়ারা সুপার মার্কেটের এম এ খান লেনে তামান্না জুয়েলার্সে প্রতারণা করে জাল টাকার বিনিময়ে সোনার গহনা কিনে নিয়ে পালিয়েছে এক প্রতারক।
জুয়েলার্স মালিক আব্দুল বারী জানান, ওইদিন বেলা ২টার দিকে সাদা শার্ট পরিহিত একব্যক্তি এসে সোনার চেইন দেখাতে বলেন। পছন্দ হওয়ার পর তিনি ৬.২৪ গ্রাম ওজনের সাবিত্রী চেইন মডেলের সোনার গহনাটির মূল্য বাবদ এক লাখ টাকার নোটের একটি বান্ডিল এবং আলাদা করে আরও ১১হাজার টাকা প্রদান করেন। টাকাগুলো গণনা ও পরীক্ষা নীরিক্ষা করার মাঝে অন্য একজন গ্রাহক চলে এলে তিনি তার সাথে কথা বলছিলেন। পরে এই সুযোগে চেইনটি নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান ওই প্রতারক।
পরে ক্যাশ মেমোতে দেখা যায়, ওই প্রতারক নিজেকে বগুড়া ক্যান্টমেন্ট এলাকার বাসিন্দা মেজর ছাব্বির রহমান নামে ভূয়া পরিচয় দিয়েছেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে জাল টাকার বান্ডিল জব্দ করে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যান।
বগুড়া সদর থানার ওসি মো. ইব্রাহীম আলী বলেন, এ ব্যাপারে ওই দোকান ও মার্কেটের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই ফুটেজ দেখে ওই প্রতারককে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বুধবার পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে কিছুদিন আগে ডিবি পুলিশ দুপচাঁচিয়া উপজেলার পশ্চিম আলোহালিপাড়া এলাকা থেকে দুই লাখ ৪৪ হাজার টাকার জালনোটসহ রাসেল মন্ডল (৩০) নামে একজনকে গ্রেফতার করে। পরে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জালনোট সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দেয় রাসেল। তিনি বলেন, সে জাল টাকার বাহক মাত্র।
অভিযানে অংশ নেয়া ডিবির এসআই মো: আব্দুল কুদ্দুস বলেন, গ্রেফতার রাসেল আরো স্বীকার করে যে, জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে এক নারীর কাছ থেকে ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার জালনোট সংগ্রহ করেছে। এরপর সেই জালনোট লাখ প্রতি আসল ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে একজনের কাছে বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ধরা পড়ে।
বগুড়ার চুড়িপট্টির প্রসাধনী ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদ বা দুর্গাপুজার সময় আসলেই বাজারে জালনোট আতংক বিরাজ করে। জালনোট নিয়ে প্রায়ই ব্যবসায়ীদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। ১শ’, ২শ’, ৫শ’ ও এক হাজার টাকার জালনোট পাওয়া যায়। কোনটা আসল আর কোনটা জাল তা বুঝে ওঠা যায়না। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হন ব্যবসায়ীরা।
ব্যাংকার চন্দ্র শেখর গকুল বলেন, আসল টাকা নাড়াচাড়া করলে খসখসে ভাব অনুভূত হবে। অন্যদিকে জাল টাকা মসৃণ হবে। এ ছাড়া জাল টাকার ক্রমিক নম্বর একই হয়ে থাকে। অনেক জাল টাকায় সিকিউরিটি সুতার মত দাগ থাকলেও ভিতরে সুতা থাকেনা। জালটাকা পানিতে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আসল টাকা পানিতে রাখলে খুব তারাতারি নষ্ট হয়না।
বগুড়া জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)’র ওসি মো: ইকবাল বাহার বলেন, মহানগর, ও গ্রামীণ হাট বাজারে জালনোটরোধে তৎপর রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি বলেন জালটাকার মুল হোতা বা গড ফাদারদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186565