বগুড়ায় শতাধিক বছরের এডওয়ার্ড পার্কের মুক্ত বাতাসে হাঁটতে বিব্রতবোধ করেন প্রবীণরা
শহর প্রতিনিধি : ডায়াবেটিস রোগী ষাটোর্ধ্ব রেহেনা বেগম নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে ৮টা-৯টার দিকে বগুড়া পৌর এডওয়ার্ড পার্কে হাঁটতেন। সেউজগাড়ি পানির ট্যাংকি সংলগ্ন বাড়ি হওয়ায় পার্কে হাঁটা তার জন্য খুব সহজ ছিলো। কিন্তু হাঁটতে এসে সকালে স্কুল-কলেজগামী ছেলে-মেয়েদের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পার্কে ঘনিষ্ট হয়ে বসে থাকাসহ অবাধ মেলামেশা দেখে তিনি সকালে হাঁটা ছেড়ে দেন।
এরপর কিছুদিন বিকেলে আসেন হাঁটতে। কিন্তু সেই সময়ও প্রায় একই রকম দৃশ্য দেখে তিনি বিব্রত হয়ে পার্কে হাঁটাই ছেড়ে দিয়ে এখন সেন্ট্রাল বা ঈদগাহ মাঠে হাঁটা শুরু করেছেন। বগুড়ায় শতাধিক বছরের পুরোনো বগুড়ার পৌর এডওয়ার্ড পার্ক প্রাতঃভ্রমণ, মুক্ত বাতাস ও শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
শহরের জিরোপয়েন্ট সাতমাথা সংলগ্ন হওয়ায় বিনামূল্যে সন্তানদের প্রকৃতির সান্নিধ্য দিতে অভিভাবকদের কাছে এটি প্রথম পছন্দ। পাশের শহীদ টিটু মিলনায়তনে সভা-সেমিনার শেষেও অনেকে শিশুদের নিয়ে পার্কে আসেন, ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা থাকে।
তবে পার্কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সকাল থেকে সারাদিন চলে কিশোর-কিশোরীদের অবাধ মেলামেশা এবং টিকটকারদের অত্যাচার। ফলে প্রবীণরা পার্কের মুক্ত বাতাসে হাঁটতে যেমন সংকোচবোধ করেন তেমনি অভিভাবকরা তাদের শিশুদের নিয়ে ঘুরতে এসে বিব্রতবোধ করেন। এছাড়া রয়েছে ছিনতাইয়ের ভয়।
পার্কের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটির নামকরণ করা হয়েছে “আনন্দ সরোবর”। শ্রী প্রভাস চন্দ্র সেনের বগুড়া ইতিহাস ও কাজি মোহাম্মদ মিছেরের বগুড়া ইতিকাহিনী বইয়ের তথ্যানুযায়ী ১৯০১ থেকে ১৯০৫ সালে তৎকালীন নবাব আব্দুস সুবাহান চৌধুরীর আর্থিক সহায়তায় ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কুমার রমেন্দ্র কৃষ্ণ দেব রায় বাহাদুরের উদ্যোগে পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের নামে এর নামকরণ হয়। পরে জে এন গুপ্তের সময়ে এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। মাঝের আনন্দ সরোবর পুকুরটি ১৯০৫ সালে জমিদার আনন্দ চন্দ্র সেনের অর্থে খনন করা হয়। অপরদিকে শিশু পার্কের পাশেই রয়েছে কৃত্রিম ফোয়ারা।
ফোয়ারাটি প্রতিষ্ঠা করেন আদমদিঘীর জমিদার সতীশচন্দ্র নিয়োগী। ১৯১৩ সালে পার্কের পশ্চিম পাশে আম বাগানের বিপরীতে গ্রিন হাউস ও কৃত্রিমভাবে পাহাড় স্থাপিত হয়। দেশ-বিদেশের ফুলে সাজানো এই পার্ক একসময় বিদেশি পর্যটকদেরও মুগ্ধ করত। বর্তমানে গ্রিন হাউসটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।
শহীদ টিটু মিলনায়তন সংলগ্ন পার্কের দক্ষিণ পাশে আশির দশকে নির্মিত হয় শিশুদের জন্য ‘মিনি শিশু পার্ক’। স্টিলের পাইপ ও রডের তৈরি দোলনা, স্লিপার, ঢেঁকিসহ শিশুদের খেলার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম সে সময় বসানো হয়। শিশু পার্কটির অধিকাংশ স্থানে ঘাস উঠে কাঁচা মাটিসহ গর্ত হয়ে গেছে।
এজন্য সামান্য বৃষ্টিতেই শিশু পার্কটি ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। গাছের কাক-বাদুড়ের বিষ্ঠায় সরঞ্জামগুলো নোংরা থাকে। এছাড়া বেশির ভাগ দোলনার বসার কাঠ নেই; যেগুলো ব্যবহারযোগ্য, সেখানে লম্বা লাইন। দোল খাওয়াতে শিশুদের নিয়ে সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাবা-মাকে। শুক্রবার পার্কে থাকে স্বাভাবিক দিনের চাইতে বাড়তি ভিড়।
গত ২ অক্টোবর শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শহরের সেউজগাড়ী, সূত্রাপুর, খান্দার, তিনমাথা ও জলেশ্বরীতলা থেকে ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে তাদের অভিভাবকরা ঘুরতে এসেছেন। একটি বেসরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় তার ৫ বছরের সন্তানসহ পরিবার নিয়ে পার্কে ঘুরতে এসেছেন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্বপরিবারে এসে তারা দেখেন সরঞ্জাম কম, জায়গাও ছোট, সবার স্থান সংকুলান হয় না। অনেক মায়ের অভিযোগ, কিশোর-কিশোরীরা ছবি তোলার জন্য দোলনায় একের পর এক বসে থাকে, বললেও শিশুদের জন্য ছাড়ে না। তদারকির অভাবে নষ্ট সরঞ্জাম সংস্কার বা প্রতিস্থাপন ছাড়াই দিনের পর দিন পড়ে আছে।
পার্কের পশ্চিম পাশে শিশুদের জন্য একটি কৃত্রিম চিড়িয়াখানা থাকলেও তা উঁচু দেয়ালে ঘেরা টিনশেডের নিচে তালাবদ্ধ, শিশুরা ভেতরে ঢুকতে পারে না। এই অংশে সিটি কর্পোরেশনসহ কারও তদারকি না থাকায় কিশোর-কিশোরীদের স্কুল কলেজ ফাঁকি দিয়ে ওই স্থানে গিয়ে অবাধে মেলামেশা, ধূমপান ও টিকটকারদের দখলদারি চলে। ফলে পার্কের মুক্ত বাতাসে হাঁটতে আসা বয়স্করাসহ শিশুদের নিয়ে ঘুরতে অভিভাবকেরা বিব্রত হন।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, আগামী নভেম্বরের মধ্যে দ্রুত কাজ শেষ করতে ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ হলে শিশু পার্কসহ পুরো পার্কের সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। লাইটিংসহ ওয়াকওয়ে চালু হলে ভোরে ও সন্ধ্যায় বয়োজ্যেষ্ঠরা নিরাপদে হাঁটতে ও ব্যায়াম করতে পারবেন, দর্শনার্থীরাও নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন। ব্যবস্থা করা হবে বাড়তি নিরাপত্তারও।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186435