আয় বৈষম্য: ধনীর আয় বাড়ে দরিদ্রের আয় কমে
বর্তমানে বাংলাদেশ সহ গোটা বিশ্বে ধনী-দরিদ্র আয় বৈষম্য একটি প্রধান সংকট হিসেবে বিরাজ করছে। একদিকে কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে সম্পদের সিংহভাগ ন্যস্ত থাকে, আর অপরদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমজুর, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষেরা তাদের রোজকার মৌলিক চাহিদা মেটাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এই আয় বৈষম্য সময়ের সাথে সাথে প্রকট আকার ধারণ করছে। আয় বৈষম্যের নেপথ্যে একাধিক কাঠামোগত কারণ বিদ্যমান।
প্রথমত, উৎপাদন ব্যবস্থা, শিল্প প্রতিষ্ঠান সহ ব্যবসা-বাণিজ্য, এই সবকিছুর মালিকানা কিছু মানুষের হাতে ন্যস্ত থাকার কারণে তাদের কাছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পণ্যের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে কিন্তু সেই অনুপাতে প্রকৃত আয় বাড়ছে না। তৃতীয়ত, পরোক্ষ কর সকল নাগরিক প্রদান করলেও,ধনীদের আয়কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ বেশি পায়। ফলে দরিদ্র মানুষের উপর সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত চাপ। করের বোঝা সৃষ্টি করে বৈষম্য।
সুযোগ সুবিধার অসম বন্টনের কারণে দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা এই দরিদ্রতার চক্র থেকে বের হতে পারে না। বাস্তবে, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বর্তমান সময়ে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের মত জরুরি এই খাত গুলো অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যেখানে খরচ সামলাতে গিয়ে গরিবরা আরও গরিব হয়ে যায় এবং তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বাস্তবে এমন আরও বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠে, বিভিন্ন বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুনাফার হার বাড়লেও সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বৃদ্ধি পায় না। এছাড়াও দুর্নীতি, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ, প্রযুক্তির প্রভাব ও দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা-এসবের কারণেও সম্পদের অসমবন্টন পরিলক্ষিত হয়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি এগিয়ে গেলেও আয়ের সমবন্টন দেখা যায়নি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০২২ সালে আয় বৈষম্যের সূচক ৩৩.৪ শতাংশ হলেও, ২০২৫-২৬ সালে এসে তা ৩৬.১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেখা যায়। যা ৪০ পার হলে উচ্চ বৈষম্যের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিগণিত হবে। ডড়ৎষফ ওহবয়ঁধষরঃু জবঢ়ড়ৎঃ অনুযায়ী বাংলাদেশের মাত্র এক শতাংশ ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ পুরো দেশের ২৪ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ।অপরদিকে, অবহেলিত ৫০ শতাংশ সাধারণ মানুষের আয় মাত্র ৪.৭ শতাংশ।বিশ্বের অর্ধেক দরিদ্র ব্যক্তিদের বৈশ্বিক আয় মাত্র ৮ শতাংশ । ঙীভধস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের ৪৮.৪ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে ১.৫ শতাংশ ধনী ব্যক্তিরা। ২০২৫-২৬ পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সংকোচন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
আয় বৈষম্যের কারণে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসমতা পরিলক্ষিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়,ধনীরাই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং তারা সবকিছু পরিচালনা করে থাকে অংশগ্রহণের সুযোগ তেমন পায় না। সমাজে নিম্নবিত্ত পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেয়ে যায়। সন্তানেরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে, তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। সম্পদের অসম বন্টনের কারণে সমাজে দিন দিন দরিদ্রতা বৃদ্ধিই পাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতা যেমন চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই এসব বৃদ্ধি পাচ্ছে বেকারত্ব ও নিপীড়িত আবহ থেকে। ফলে বেঁচে থাকার তাড়নায় অনেক মানুষ অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দিন দিন অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে এবং গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।এমতাবস্থায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করে সমাজের সকল পর্যায়ে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে হবে।
সুপার রিচ ট্যাক্স বা ধনীদের উপর কর আরোপ করে সম্পদের সুষম বন্টন সমাজে নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত করে তা আরো শক্তিশালী করে বাস্তবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।শ্রমিকদের প্রাপ্য নির্ধারিত মজুরি সময়মত প্রদানে সক্রিয় থাকতে হবে। বর্তমান বাজারের সাথে ভারসাম্য রেখে শ্রমিকদের জন্য পুননির্ধারণ মজুরি প্রণয়ন করতে হবে, যেন বাজার ব্যবস্থার সাথে তা সামঞ্জস্য হয়।প্রগতিশীল করনীতি আরোপ করতে হবে, অর্থাৎ ধনীদের বিলাসবহুল পণ্যের উপর ইনকাম ট্যাক্স আরোপ করতে হবে এবং অন্যদিকে গরিবদের করের চাপ কমাতে হবে। যেসব সিন্ডিকেট বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারো যেন মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন না হয়।বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু, বয়স্ক, বিধবা, হতদরিদ্রদের সরকার প্রণোদিত ভাতা প্রদান করতে হবে। ক্ষুদ্র, মাঝারি বা কুটির শিল্প বা কৃষকদের জন্য কম সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। এর ফলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং সর্বক্ষেত্রে আয়ের সুষম বন্টন নিশ্চিত হবে। সম্পদ ও আয়ের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈষম্য হ্রাস করে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
লেখক: ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186318