অপরাধীদের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই, আ.লীগ প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পিকার
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেছেন, ট্রুথ কমিশনের ক্ষেত্রে প্রথমে অপরাধ স্বীকার, এরপর রিকনসিলিয়েশন বিষয়টি আসে। কিন্তু তারা (আওয়ামী লীগ) বিদেশে অবস্থান করছে, তারা কোনো ধরনের অনুশোচনা দেখাচ্ছে না। তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কমিশনের প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। তাই এসব অপরাধীর সঙ্গে কোনো ধরনের রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ নেই। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর পান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের শেষ দিনে ‘দ্য গ্র্যান্ড কনভারসেশন: জাস্টিস, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন’ শীর্ষক সংলাপে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ৫ আগস্টের আগের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে কোনো রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ নেই। নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ও নির্মম কর্মকাণ্ড চালানোর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে অংশগ্রহণের নৈতিক বৈধতা স্থায়ীভাবে হারিয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা দেখেছি, রিকনসিলিয়েশন ব্যর্থ হয় যখন এটিকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দায়ীদের আইনি পরিণতি থেকে রক্ষা করার একটি সুবিধাজনক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ন্যায়বিচার ছাড়া ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন শান্তি নয়, এটি কেবল সংঘাতের মধ্যবর্তী একটি বিরতি। অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ বা সময়ের আগেই ঐক্যের আহ্বানের বিষয় নয়। এর জন্য দায়মুক্তির কাঠামোকে সুনির্দিষ্ট, পদ্ধতিগত ও গভীরভাবে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন।
কায়সার কামাল বলেন, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া সাবেক শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবশিষ্টাংশের কারণে বারবার হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে এই মূল্যায়ন এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বা একাডেমিক অনুশীলন নয়, এটি আমাদের তাৎক্ষণিক বাস্তবতা।
৫ আগস্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে ও ওই দিন পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা কেবল একটি প্রশাসনের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি মৌলিক পুনর্নির্ধারণ। জনগণ এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা পক্ষপাত, পৃষ্ঠপোষকতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর আঘাতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, এই শাসনব্যবস্থা এতটাই নির্মম ছিল যে, তারা আইনের শাসনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল। এর পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে একজন স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রাখার জন্য মানুষকে হত্যা করাকেও বৈধ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু।
কায়সার কামাল বলেন, এই বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। এর উদ্দেশ্য একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বাংলাদেশে আবার এমন কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সাহস না পায়।
তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এখন বিচ্ছিন্নভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আবার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। দুঃখজনকভাবে, দেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু মহল রিকনসিলিয়েশনের নামে তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের ধারণা গ্রহণ করলে দেশ আবার সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে, যার পরিণতি হবে গুরুতর।
তিনি আরও বলেন, যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো জনগণকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেই কাঠামোকেই যারা পরিকল্পিতভাবে জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তাদের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন করা যায় না। আমরা আমাদের অতীতের দুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের প্রত্যাখ্যান করছি। বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নিজের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186269