বগুড়া শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যানে নামেই শিশু উদ্যান, নেই কোন বিনোদনের ব্যবস্থা
শহর প্রতিনিধি : বগুড়া মহানগরের জিরোপয়েন্ট সাতমাথা থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যান। ডাকঘর সংলগ্ন এই পার্কটির সাইনবোর্ডে শিশু উদ্যান লেখা থাকলেও পার্কের ভেতরের চিত্র একেবারেই বিপরীত। নামে শিশু উদ্যান হলেও শিশুদের বিনোদেনের জন্য এখানে নেই কোনো রাইড, দোলনা বা স্লিপার। বছর জুড়েই পার্কটি থাকে বড়দের দখলে।
সারা বছর রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন মেলা হয়। অন্য সময় পার্কটি থাকে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের দখলে। শিশুদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোর শহীদ মিনার বেদিতে লুকোচুরি খেলা ছাড়া আর কিছু করার সুযোগ পায় না।
মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোহাম্মদ পাইকাড় খোকনের নামে পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যখন পাক সেনারা বগুড়ার দিকে রওনা হয় তখন তরুণ খোকন মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে বগুড়া শহরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মূলত তাঁদের প্রতিরোধের কারণেই পাক সেনারা বেশ কিছুদিন বগুড়া শহরে ঢুকতে পারেন নি।
পরে খোকন সঙ্গীদের নিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যান। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল জয়পুরহাট জেলার (তৎকালীন বগুড়ার মহকুমা) আক্কেলপুরে পৌঁছেন। সেখানে একটি বাড়িতে রাত্রি যাপনের জন্য আশ্রয় নেন। কিন্তু ওই বাড়ির মালিক খোকনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং তাদের অবস্থানের খবর পাক বাহিনীকে জানিয়ে দেয়।
পরে হানাদাররা ওই বাড়িতে ঢুকে খোকনসহ তার ১৬জন সহযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে, দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ জুন। খোকন শহীদ হবার সাত বছর পর ১৯৭৮ সালে ওই স্থানে শহরের প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর আগে বৃটিশ ও পাকিস্তান সরকারের সময় ওই স্থানে পুকুর ছিলো।
পরে পুকুরটি বন্ধ করে ময়লার ভাগারে পরিণত করা হয়েছিলো বলে জানিয়েছেন বগুড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান বেচান। পার্কটি ৭৮ সালে ওখানে শহীদ মিনার নির্মাণসহ শিশুদের জন্য পার্ক করা হলেও পার্কটিতে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ ও বছরজুড়ে বিভিন্ন মেলা বসে।
এছাড়া পার্কের ভেতরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও বেদেদের চাঁদা আদায়সহ ভবকুড়েদের পায়চারি লক্ষ্য করা যায়। অপরদিকে পার্কের প্রবেশমুখ ও চারপাশে চা-সিগারেট, কাপড়, সিম ও খাবারের দোকানের কারণে পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে।
সূত্রাপুরের বাসিন্দা সোমা আক্তার জানান, বাচ্চাদের নিয়ে এই পার্কে শুধু মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে আসা হয়। অন্য সময় যে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে আসবো সে পরিবেশ নেই। এছাড়া পার্কটির সাইন বোর্ডে শিশু উদ্যান লেখা থাকলেও শিশুদের বিনোদনের জন্য কোনো রাইড রাখা হয়নি।
জলেশ্বরীতলার বাসিন্দা ব্যাংকার হাসান জানান, রাইডের অভাবে শহরের সরকারি পার্কগুলোতে মধ্যবিত্তরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসতে পারেন না। ব্যক্তিমালিকানাধীন ইকো পার্কসহ বেসরকারি শিশু পার্কের খরচ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। বগুড়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানায়, স্কুলের কাছে হলেও এটি তাদের কাছে শিশু উদ্যান নয়, কেবলই একটি ফাঁকা মাঠ।
সম্প্রতি পশ্চিম পাশের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বহুতল ফুল মার্কেট নির্মাণের ফলে পার্কটি নিজস্বতা হারানোর পাশাপাশি সব শ্রেণির মানুষের অবাধ বিচরণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে পৌরসভা বিনোদন পার্কের রাইড ও স্থাপনা নির্মাণে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের সংস্কার হলেও অবহেলিত থেকে যায় খোকন পার্ক।
ওই বছরের বাজেট স্মারক বইয়ে এডওয়ার্ড পার্ক, খোকন পার্কসহ সাতটি পার্কে দোলনা, স্লিপার ও কিডস রাইড স্থাপনের কথা বলা হলেও বাস্তবে খোকন পার্কে আছে শুধু শহীদ মিনার আর ফাঁকা ময়দান। একই স্মারক বইয়ে পার্ক নির্মাণ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালে নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের বাজেটে শহরের অন্যান্য সরকারি পার্কসহ এই পার্কটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও আগের মতো এবারও নেই সংস্কার কিংবা আলাদা বরাদ্দ বা পরিকল্পনা।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, খোকন পার্কে আর কোনো সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। এ ছাড়া উপযুক্ত জায়গা পেলে ওয়ার্ড পর্যায়ে মিনি শিশু পার্ক গড়ে তোলা হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186155