গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে বিস্মৃতির পথে পাতা খেলা
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: একসময় পাতা খেলার আয়োজন মানেই ছিল গ্রামে উৎসবের আমেজ। মাঠের চারপাশে জড়ো হতেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ঢোলের বাদ্য, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর প্রতিযোগীদের উত্তেজনায় মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা।
দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসতেন এই খেলা দেখতে। তবে সময়ের সাথে বদলে গেছে সেই চিত্র। আধুনিক বিনোদন, প্রযুক্তির বিস্তার ও নিয়মিত আয়োজনের অভাবে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পাতা খেলা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।
আগের মতো নিয়মিত পাতা খেলার আয়োজন নেই। দীর্ঘদিন অনেক এলাকায় এ ধরণের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে কোথাও খেলার আয়োজন করা হলে এখনও দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এতে স্পষ্ট হয়, মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মূল সংকট নিয়মিত আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতার।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এ খেলায় মাঠের মাঝখানে কলাগাছ রেখে তন্ত্র-মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের পাতা নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। খেলাটির সাথে স্থানীয় লোকাচার ও গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি যোগসূত্র রয়েছে। এ কারণে এটি শুধু বিনোদন নয়, স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতিরও একটি অংশ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে পাতা খেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় খেলা ছিল মানুষের অবসর ও আনন্দের অন্যতম মাধ্যম। কোনো এলাকায় খেলার আয়োজন হলে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও দল বেঁধে সেখানে যেতেন।
খেলা উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বাড়ত, বসত ছোটখাটো মেলা এবং তৈরি হতো সামাজিক মিলনমেলার পরিবেশ। স্থানীয়দের মতে, পাতা খেলার মতো দেশীয় খেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন গেম, শিশু-কিশোরদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।
পাশাপাশি গ্রামীণ খেলার মাঠ কমে যাওয়া, ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর নিয়ম নতুন প্রজন্মকে শেখানোর উদ্যোগের অভাব এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় এসব খেলার চর্চা কমে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, পাতা খেলাসহ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের দেশীয় খেলাগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এসব খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে স্থানীয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন দিবসের আয়োজনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নিকট অনুরোধ করবো। তবে স্থানীয় সংগঠন ও তরুণদের উদ্যোগ থাকলে যুব উন্নয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা সহজ হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/186154