ডিজিটাল ব্যাংকিং যেন ডিজিটাল চুরির নয়া বন্দোবস্ত না হয়

ডিজিটাল ব্যাংকিং যেন ডিজিটাল চুরির নয়া বন্দোবস্ত না হয়

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে 'ডিজিটাল ব্যাংক' পরিচালনার প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়াও কৃষি ঋণ এবং গবাদিপশু পালন, পোলট্রি ও মৎস্য খামারের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে 'এএফসি ব্যাংক লিমিটেড' নামে নতুন একটি তফসিলি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবীর পাটওয়ারী। 

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬১টি তফসিলী ব্যাংক রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ঋণ দিচ্ছে দেশের শতাধিক বৃহৎ এনজিও প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্র এনজিও, সমবায় সমিতি, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমি আলোচনার বাইরে রাখছি। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের এই উদ্যোগ কি ইতিবাচক? এটা কি এখনই প্রয়োজন ছিল? কেন নাগরিক সমাজ এই প্রশ্ন তুলছে? কারণ প্রত্যেক সরকার বিদায়ের পর তাদের শাসনামলে লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। 'যা রটে তার কিছুটা বটে'- এই প্রবাদ মেনে প্রশ্ন রাখছি কিভাবে এত্ত এত্ত টাকা পাচার হয়? এগুলোর সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কী কোন সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকে? বলা হয় ক্ষমতায় থাকা সরকারের সহযোগিতায় কিছু কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই অর্থ পাচারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও অব্যবস্থাপনাজনিত সংকটে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক চরম সংকটে রয়েছে, ভোগান্তিতে রয়েছে কয়েক লক্ষ গ্রাহক।

নাগরিক সমাজ বিশ্বাস করতে চায়, তারেক রহমান সরকার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই নতুন করে পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংক এর অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু 'চুন খেয়ে মুখ পোড়া'-ভুক্তভোগী জনসাধারণ এ ধরনের উদ্যোগকে সতর্কতার সাথে দেখার পক্ষে। এটা কোন দোষের নয়। সন্দেহটা তৈরি হয়েছে কারণ আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, দেশে নতুন করে কোন ব্যাংক তৈরি না করে বরং বিদ্যমান সংকটময় ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া এবং জনগণের ভোগান্তি দূর করা জরুরি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে জোরদার করতে হবে এবং তার জন্য বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। বর্তমান সরকার ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছেন। এর বাইরে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার কৃষক, কৃষিভিত্তিক এসএমই উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিতে তথা উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩ হাজার কোটি টাকার আরও একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। 

আমরা সরকারের এই উদ্যোগগুলোকে সাধুবাদ জানাই। যদিও এসব তহবিল রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের বাইরে থাকা সাধারণ কৃষক, কৃষিভিত্তিক এসএমই উদ্যোক্তাগণ কতখানি পাবেন তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংস্কৃতিতে এখনও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই প্রবণতা, যা বৈষম্য তৈরি করে সেটি বন্ধের প্রেরণাতেই দেশে বিরাট এক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। ক্ষমতার বদল হয়েছে সত্য কিন্তু ব্যবস্থার কী কোন পরিবর্তন আসলে হয়েছে? হয়নি বলেই সরকারের ইতিবাচক দাবী করা উদ্যোগগুলিও নাগরিকদের মনে সন্দেহ-সংশয় তৈরি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংক বিকাশ, নগদসহ তাদের গ্রাহকদের ডিজিটাল মাধ্যমে ও অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম, সিডিএম, সিআরএম ব্যবহার করে সেবা প্রদান করবে। এর ফলে কম পরিচালন ব্যয়ে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো আরও সহজে সকল ধরনের নাগরিককে সেবা প্রদান করতে পারবে। যদিও বর্তমানে বিকাশসহ অন্যান্য ডিজিটাল ওয়ালেটগুলো জনগণের কাছ থেকে যে চার্জ কাটে তা অসহনীয়, অগ্রহণযোগ্য এবং আমার বিবেচনায় তা অযৌক্তিক। সরকারের অনুমোদিত ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর প্রতি অনুরোধ, দয়া করে আপনারা জনগণের উপর চার্জ কমাবেন, কারণ আপনারাই বলছেন ডিজিটাল ব্যাংকিং-এ পরিচালন ব্যয় কম।

সরকার ব্যাংকিংখাতের বিস্তৃতি চাইছে আর্থিক খাতে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। যদিও প্রাপ্ত তথ্য মতে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ গ্রাহকের কাছে যায়। আর এদেরই প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণখেলাপি। তাই, ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর কাছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহের দাবী জানাই। সাধারণ মানুষ এখনও ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, বিধায় ডিজিটাল ব্যাংকগুলোকে তাদের সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেবাকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে তুলতে হবে।

আমাদের অর্থনীতি এখনও খুবই ছোট। এত্ত ছোট এই অর্থনীতির দেশে অনেক ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন কিনা সেই প্রশ্নের বাইরেও খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি যেমন- হ্যাকিং, ফিশিং, ওটিপি চুরি এবং পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহারে সহজেই প্রতারকদের ফাঁদে পা দেয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সফটওয়্যারের অ্যালগরিদমিক ভুলের কারণেও সাধারণ গ্রাহকদের বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং কাগজের টাকার ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে। তবে এর সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি। ডিজিটাল ব্যাংকিং যেন ডিজিটাল চুরির নতুন বন্দোবস্ত না হয়, আমরা সরকারের কাছে সেই অনুরোধটাই রাখছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/185564