পাখির ডানা

পাখির ডানা

আমি, মিজান আর সাব্বির পাথরবাড়ি গ্রামের তিন বন্ধু। সেই সময় পায়ে জুতো ছিল না, কাঁধে ব্যাগ ছিল না, কিন্তু মনে ছিল অফুরন্ত স্বাধীনতা। বিকেল হলেই আমরা ছুটে যেতাম গ্রামের পাশের বনের দিকে। হাতে থাকত একটা পাখির খাঁচা আর গুলতি। মিজান ছিল পাখি ধরার ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী। আমি গুলতি চালাতাম। আর সাব্বির? সে আমাদের সঙ্গে থাকলেও পাখির দিকে তাকালেই তার চোখেমুখে কেমন একটা মায়া ফুটে উঠত। সেদিন বিকেলের কথা আজও মনে আছে। আকাশে রোদ গলে পড়ছিল পাতার ফাঁক দিয়ে। আমরা বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ মিজান আমার হাত ধরে থামিয়ে দিল। ওই দেখ! আমি উপরে তাকালাম। একটা নীলচে পাখি গাছের চূড়ার কাছের ডালে বসে আছে। মিজান আস্তে করে বলল, জুবায়ের, গুলতি দে। ওইটাকে নামাতে পারবি? আমি গুলতি হাতে নিয়ে বললাম, চেষ্টা করি। সাব্বির সঙ্গে সঙ্গে বলল,

আস্তে করিস কিন্তু। আমি হেসে বললাম, আরে, জানি তো। পাখিটাকে মারব নাকি! গুলতি টেনে ধরলাম। পাথর ছুটে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে পাখিটা ডানা মেলে উড়ে গেল। আমরা ভাবলাম, বেঁচে গেল। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে পাখিটা নিচের ঝোপের পাশে পড়ে গেল। সাব্বির চিৎকার করে উঠল, ওই! পড়ে গেছে! আমরা তিনজন দৌড়ে গেলাম। পাখিটা ডানা ঝাপটাচ্ছে, কিন্তু উড়তে পারছে না। একটা ডানায় আঘাত লেগেছে। মিজান খাঁচাটা বের করে বলল, এখন কী করব?

সাব্বির পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলল, আগে বাড়ি নিয়ে চল। দেখি কী হয়। আমি পাখিটাকে সাবধানে তুলে খাঁচায় রাখলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি খাঁচার কাছে গেলাম। পাখিটা এদিক-ওদিক ছুটছে। কখনো শিকের কাছে এসে বাইরে তাকাচ্ছে, আবার ডানা ঝাপটাচ্ছে। মিজান এসে বলল, এত ছটফট করছে কেন? সাব্বির একটু চুপ থেকে বলল, বুঝতে পারছিস না? কী? বাইরে যেতে চায়। মিজান খাঁচার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি কিছু বললাম না। পাখিটা আবার ডানা ঝাপটাল। তারপর খাঁচার দরজার কাছে এসে স্থির হয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল।

সেদিন প্রথমবার আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমরা তো পাখিটাকে বাঁচানোর জন্য খাঁচায় রেখেছি। কিন্তু ওর চোখে যেন বনের সেই খোলা আকাশটাই খুঁজে ফিরছে। বিকেলে আমরা তিনজন খাঁচাটা নিয়ে আবার বনের দিকে গেলাম। মিজান বলল,এখন ছেড়ে দিবি? আমি বললাম, হ্যাঁ। দেখছিস না, ভালো হয়ে গেছে। মিজান একটু ইতস্তত করে বলল, আবার যদি পড়ে যায়? সাব্বির বলল, পড়লে আবার দেখব। আগে ওকে উড়তে দে। আমি খাঁচার দরজা খুলে দিলাম। পাখিটা প্রথমে বের হলো না। দরজার কাছে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বাইরে এল। একবার ডানা ঝাপটাল। তারপর হঠাৎ উড়ে গেল। প্রথমে নিচু হয়ে উড়ল। তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠল। কিছুদূর গিয়ে একটা গাছের ডালে বসে আমাদের দিকে তাকাল। মিজান হেসে বলল, দেখ! ঠিকই উড়ছে! সাব্বিরও হেসে উঠল। বলেছিলাম না? আমি পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফেরার পথে মিজান হঠাৎ বলল, শোন, আর পাখি ধরব না। আমি মজা করে বললাম, তাহলে গুলতি? মিজান একটু ভেবে বলল, গুলতি থাক। তবে পাখির দিকে আর না।

সাব্বির হেসে বলল, তাহলে খাঁচাটাও রেখে দে। মিজান বলল, হ্যাঁ। কোনো পাখি আহত হলে কাজে লাগবে। সেদিনের পর সত্যিই আমাদের খেলা বদলে গেল। আগে আমরা বনে যেতাম পাখি ধরতে। এখন যেতাম পাখির ডাক শুনতে। কোনো পাখি আহত অবস্থায় পড়ে থাকলে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। যত্ন করতাম। সুস্থ হয়ে উঠলে আবার বনের মধ্যে ছেড়ে দিতাম। গ্রামের লোকজন আমাদের দেখে হাসত। বলত, তিন পাগল ছেলে! পাখি ধরতে গিয়ে এখন পাখি বাঁচায়! আমরা কিছু বলতাম না।

আমাদের কাছে খাঁচাটা তখন আর পাখি বন্দি করার জিনিস ছিল না। কোনো অসহায় পাখির জন্য সেটাই হয়ে উঠেছিল সাময়িক আশ্রয়। তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। পাথরবাড়ির সেই বনও হয়তো আগের মতো নেই। মিজান আর সাব্বিরও যার যার জীবনে ব্যস্ত। আমাদের সেই বিকেলগুলোও আর ফিরে আসবে না। তবু শহরের কোনো এক বিকেলে বাঁশপাতার শব্দ শুনলে আমার সেই নীলচে পাখিটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে, আমরা তিনজন বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর একটা ছোট পাখি ডানা মেলে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গিয়েছিল।
সেই দৃশ্যটা আজও আমার চোখে ভাসে। পাখিটা কোথায় গিয়েছিল, জানি না।

 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/185020