ঢাবিতে ভর্তি হয়েও টাকার কাছে থমকে যাচ্ছে আলামিনের স্বপ্ন
ঢাবি প্রতিনিধি : ভাঙা কাঠের চেয়ার। সামনে পুরোনো একটি টেবিল। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই। মাথার ওপর টিনের ছাদ। দিনের আলো ফুরিয়ে এলে ঘরটিতে পর্যাপ্ত আলো জ্বালানোর ব্যবস্থাও নেই। এই ছোট্ট ঘরেই বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বই পড়ছেন মো. আলামিন হোসেন।
অথচ এখন তাঁর থাকার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আবাসিক হলের কক্ষে। বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস, পড়াশোনা আর সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু অর্থের কাছে হার মেনে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার হল ছেড়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রাজাপুর গ্রামের বাড়িতে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আলামিন এখন জানেন না, কবে আবার ঢাকায় ফিরতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় অর্থাভাবে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে আলামিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরের এক কোণে বসে বই পড়ছেন তিনি। ঘরে নেই ভালো চেয়ার-টেবিল, নেই প্রয়োজনীয় আসবাব। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা।
আলামিন বলেন, ‘ভর্তির দুই মাস পরে হলে উঠেছিলাম। থাকা-খাওয়া আর পড়াশোনার জন্য মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা লাগে। বাবা ভ্যান চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসারই চলে না। তাই ঢাকায় টিকতে পারিনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে বাড়িতে চলে এসেছি।’
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর আমি বাড়িতে বসে আছি। অনেক কষ্ট করে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। এখন টাকার জন্য পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে কি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
আলামিনের এই স্বপ্নের পথটিও ছিল সহজ নয়। ২০২৩ সালে ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে শৈলকুপার কাতলাগাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারে বিনা খরচে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির সুযোগ পান।
ভর্তি পরীক্ষায়ও মেধার স্বাক্ষর রাখেন আলামিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটে ২০তম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে ৯৫তম এবং বি ইউনিটে ৫২৬তম স্থান অর্জন করেন। স্থানীয়দের সহযোগিতা ও ধারদেনা করে শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় নতুন লড়াই। পড়াশোনার পাশাপাশি ঢাকায় থাকার খরচ জোগাড় করাই তাঁর পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আলামিনের বাবা আলেফ আলী পেশায় ভ্যানচালক। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন তিনি। এই সামান্য আয়েই চালাতে হয় পরিবারের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন। সংসারে আলামিন ছাড়াও রয়েছেন তাঁর সৎমা রোকসানা বেগম, বৃদ্ধ দাদি চন্দনা খাতুন এবং স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
ছেলের পড়াশোনার খরচের কথা বলতে গিয়ে অসহায় কণ্ঠে আলেফ আলী বলেন, ‘ভ্যান চালাইয়া দিনে ৪০০-৫০০ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালাই। ছেলের পড়ার খরচ কীভাবে দেব? টাকার অভাবে ছেলে ঢাকা থেকে চলে আসছে। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত।’
আলামিনের জীবনে অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজন হারানোর গভীর ক্ষতও। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা ও ঋণের চাপে ২০২৩ সালে তাঁর মা কাজলী খাতুন আত্মহত্যা করেন। মাকে হারানোর পর তাঁর পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে গ্রামের মানুষ ও স্বজনদের সহযোগিতায় আবার পড়াশোনায় ফিরেন তিনি।
সৎমা রোকসানা বেগম বলেন, ‘আমরা চাই ও পড়ুক। ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। অনেকের সহযোগিতায় এতদূর এসেছে। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নেই। টাকার অভাবে বাড়ি চলে এসেছে। সহযোগিতা পেলে পড়াশোনাটা শেষ করে কিছু একটা করতে পারত।’
গ্রামের মানুষও আলামিনকে নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিকূলতার মধ্যেও ছেলেটি কখনো পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে আলামিন। তাঁর হাতে বই আছে, আছে পড়ার ইচ্ছা; শুধু নেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল আলামিনের। এখন তাঁর একমাত্র স্বপ্ন—টাকার কাছে যেন সেই স্বপ্নটা হেরে না যায়।