সংকটের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়ল,আবাসিক-শিল্পে ফিরছে স্বস্তি

সংকটের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়ল,আবাসিক-শিল্পে ফিরছে স্বস্তি

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা অফিস : গত কয়েকদিনে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতের গ্রাহকদের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বাড়ায় রান্না ও শিল্পকারখানার কাজে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য অপেক্ষার সময় কিছুটা কমেছে। তবে সরবরাহ বাড়লেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি থাকায় এখনো অনেক এলাকায় কম চাপ ও নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় আবাসিক ও শিল্পে সরবারহে গতিও কিছুটা বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় আগের তুলনায় ভোগান্তি কমার চিত্র দেখা গেছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতে ভিড় আগের তুলনায় কমেছে। আগে যেখানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস নিতে হতো এখন সেখানে ঘণ্টাখানেক বা তারও কম সময় অপেক্ষা করেই গ্যাস নিতে পারছে। আবাসিকে সরবরাহ বাড়ায় রান্নাঘরেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। আগে যেখানে সারাদিনে গ্যাস পাওয়া যেতো না, এখন কিছুটা চাপ বাড়ায় রান্নার কাজ সারতে পারছেন গৃহিণীরা।
মিরপুরের বাসিন্দা আকলিমা বলেন, গত দুদিন ধরে গ্যাস পাচ্ছি। রান্না করতে পারছি। মাঝে কিছুদিন রান্না করা প্রায় অসম্ভব ছিল। হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে। এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।

আজিমপুরের বাসিন্দা জান্নাতী সুলতানা বলেন, গ্যাস মাঝে কিছুদিন তো একেবারেই পাচ্ছিলাম না। গত দুদিন ধরে কিছুটা পাচ্ছি। এখন রান্নার কাজটা মোটামুটি সেরে নেওয়া যাচ্ছে।

শাহবাগে সিএনজি অটোরিকশাচালক ইয়ার আলী বলেন, মাঝে এক মাস খুব ঝামেলায় গেছে। গ্যাস পেতামই না। গত দুদিন ধরে একটু পাচ্ছি। আগে তিন ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ৭০-৮০ টাকার গ্যাস নিতে হতো। এখন সময় কম লাগছে। গ্যাসের চাপও খানিকটা বেশি।

এছাড়া শিল্প কারখানাগুলোতেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে খাত সংশ্লিষ্টদের। এখন উৎপাদন কার্যক্রমও অনেকটা স্বাভাবিক গতিতে চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের চেয়ে এখন সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। আর বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। জ্বালানি সংকটের এই অভিঘাত বোঝা যাবে আরও অন্তত তিন মাস পর।

তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তা কার্যকর হয়েছে। 

৪ দিনে সরবরাহ বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট:  বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত চারদিনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের মোট উৎপাদন ও পুনঃগ্যাসীকরণ মিলিয়ে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) বেড়েছে। এসময়ে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন তুলনামূলকভাবে প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট গ্যাস উৎপাদন ও আরএলএনজি (রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি) সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। পরদিন ১৪-১৫সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৭৮ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে হয় ২ হাজার ৬০৪ এমএমসিএফডি। সর্বশেষ ১৬-১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে মোট সরবরাহ ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডি হয়েছে।

অর্থাৎ, ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৬-১৭সেপ্টেম্বর দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি বা প্রায় ১১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে চারদিনের এই বৃদ্ধির প্রধান উৎস স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র নয়, তা এসেছে এলএনজি থেকে। 

৩-১৪ সেপ্টেম্বর আরএলএনজিথেকে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৭৩১ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি। ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৮৫৮ দশমিক ৪ এমএমসিএফডি, ১৫-১৬সেপ্টেম্বর ৯৮২ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি এবং ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ৯৮২ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি হয়েছে। চারদিনে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি, যা মোট বৃদ্ধির প্রায় ৯৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি থেকে ১৬-১৭সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬২৩ দশমিক ২ এমএমসিএফডি হয়েছে। অর্থাৎ, স্থানীয় উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি।

স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) উৎপাদন ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ৪৮২ দশমিক ৪ এমএমসিএফডি থেকে ১৬-১৭সেপ্টেম্বর ৪৮৪ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি হয়েছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফএল) উৎপাদন ১৩৯ দশমিক ২ থেকে ১৩৯ দশমিক ১ এমএমসিএফডি হয়েছে। বাপেক্সের উৎপাদন ১০০ দশমিক ৩ থেকে ১০৫ দশমিক ৪ এমএমসিএফডি হয়েছে। এছাড়া বিদেশি কোম্পানিগুলোর (আইওসি) গ্যাস উৎপাদনও খুব সামান্য বেড়েছে। ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর তাদের উৎপাদন ছিল ৮৯১ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি, যা ১৬-১৭সেপ্টেম্বর ৮৯৪ এমএমসিএফডি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের মোট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৮৫৪ এমএমসিএফডি। এর বিপরীতে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ, মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। চারদিন আগে ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর সক্ষমতার ব্যবহার ছিল ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ।প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও এলএনজি থেকে সরবরাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাসের পরিমাণও বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক অধ্যাপক, ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস সংকট আজকের সমস্যা নয়, এটি বহু পুরানো সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। যদিও কার্যক্রমে আমাদের দুর্বলতা আছে। এজন্য আমরা বারবার সংকটের মধ্যে পড়ি। আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।

একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও কাজে থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে এ কাজগুলো করতে পারলে সংকট কাটবে।
'বাংলাদেশ ডেল্টা এরিয়া, পৃথিবীর সব ডেল্টা এরিয়াতে গ্যাস আছে। বাংলাদেশেও আছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে আমরা অর্থনৈতিকভাবেও সাবলম্বী হতে পারবো'-যোগ করেন এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/184222