আড্ডার টেবিলে অনুপস্থিত প্রিয়জন

আড্ডার টেবিলে অনুপস্থিত প্রিয়জন

লাইফস্টাইল ডেস্ক : উপস্থিতি নেই অথচ আড্ডার টেবিলে তাদের নিয়েই কথা জমে উঠেছে। কে কার সঙ্গে সম্পর্কে আছেন, কে নতুন চাকরি পেলেন, কার সঙ্গে কার মনোমালিন্য— একটি প্রসঙ্গ থেকে আরেকটি প্রসঙ্গ। কখনও হাসি-ঠাট্টা, কখনও বিস্ময়, কখনও আবার সত্যিই কারও আচরণ নিয়ে উদ্বেগ। সামাজিক জীবনে অন্যের অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে কথা বলা এতটাই স্বাভাবিক যে, একে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে সেই কথাই কখন যে গল্প থেকে গুজব, আর গুজব থেকে অপমান হয়ে যায়, সেটিই বোঝা আসল বিষয়।
মনোচিকিৎসকরা বলেন, পরিচিত কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে খোলামেলা কথা বলা অনেক সময় মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও আস্থার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, অন্যের কথা বললেই তা খারাপ বা বিষাক্ত হয়ে যায় না। আসল বিষয় হল- কী বলা হচ্ছে, কেন বলা হচ্ছে এবং কথাটি আসলে কার ক্ষতি করতে পারে।

কেন অন্যের কথা বলা হয় : আশপাশের মানুষের আচরণ, সম্পর্ক, সাফল্য বা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা সামাজিক যোগাযোগেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। বন্ধুর সঙ্গে বসে কারও আচরণ নিয়ে নিজের দ্বিধা প্রকাশ করা, পরিচিত কারও কোনো সিদ্ধান্ত বুঝতে না পেরে মতামত চাওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে কোনো ঘটনার বিষয়ে সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করা— সবকিছুই একই ধরনের কথাবার্তার মধ্যে পড়ে।
তবে এখানে উদ্দেশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিষয়ে কথা বলার কারণ যদি হয় নিজের অনুভূতি বোঝা, পরামর্শ নেওয়া বা কোনো পরিস্থিতি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া, তাহলে তা অন্য রকম। তবে কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা, তাকে ছোট করা বা শুধু বিনোদনের জন্য তার ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সম্পর্কের মধ্যে মতবিরোধ বা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, গুরুত্বপূর্ণ হল সেই সম্পর্ককে কীভাবে মেরামত করা হচ্ছে। আর এই ধারণা বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ, বন্ধুর কোনও আচরণে কষ্ট পেলে তার অনুপস্থিতিতে সবাইকে বলে বেড়ানোর বদলে প্রথমে বোঝা দরকার, আসলে নিজের কী প্রয়োজন।

কথা বলার আগে উদ্দেশ্যটা বোঝা : বন্ধুর ফোন রেখে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আরেক বন্ধুকে বলা— ‘জানো, ও আজ কী করেছে?’— এভাবেই অনেক সময় একটি সাধারণ ঘটনা দীর্ঘ আলোচনায় পরিণত হয়। প্রথমে হয়ত নিজের বিরক্তি প্রকাশের প্রয়োজন ছিল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বিরক্তির সঙ্গে যোগ হয় অনুমান, বিচার আর নানান গল্প। নিজের বিরক্তি বা ক্ষোভ প্রকাশের প্রয়োজন কখনও কখনও স্বাভাবিক এবং উপকারী হতে পারে। তবে কথোপকথনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকলে, সেটি নেতিবাচক আবেগকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।তাই কারও বিষয়ে কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যায়— ‘আমি কি পরামর্শ চাইছি, আশ্বস্ত হতে চাইছি, নাকি শুধু রাগ ঝাড়তে চাইছি?’

শোনা কথা আর সত্য এক নয় : অন্যের বিষয়ে কথা বলার ঝুঁকি হল, অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ‘শুনেছি চাকরি চলে গেছে’— এটি এক ধরনের তথ্য। তবে ‘ও নিশ্চয়ই কাজে খারাপ ছিল, তাই চাকরি গেছে’— এটি একটি অনুমান। আবার ‘ওর সংসারে সমস্যা চলছে’ বলার পর যদি কেউ নিজের মতো করে সমস্যার কারণ বানিয়ে নেয়, তাহলে কয়েকজনের মুখ ঘুরে সেই গল্প সম্পূর্ণ অন্য রূপ নিতে পারে।
তাই কোনও কথা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলে ভাষাতেও সেই অনিশ্চয়তা থাকা দরকার। বলা যায়, ‘আমি এমনটা শুনেছি, তবে আসলে কী হয়েছে জানি না।’ এই একটি বাক্য অনেক ক্ষতি কমাতে পারে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা।

মানুষকে নয়, আচরণকে নিয়ে কথা বলা : বন্ধুদের আড্ডায় সহজ ভুলগুলোর একটি হল, একটি আচরণ থেকে পুরো মানুষটিকে বিচার করে ফেলা। একজন বন্ধু কোনো অনুষ্ঠানে আসেননি। সেখান থেকে বলা হলো, ‘ও কখনও কারও কথা ভাবে না।’ কেউ সময়মতো উত্তর দেননি। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য এল, ‘ও খুব অবহেলাকারী।’ তবে একটি ঘটনা দিয়ে একজনের সম্পূর্ণ চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। বরং নির্দিষ্ট আচরণ নিয়ে কথা বললে আলোচনাটি অনেক বেশি সঠিক থাকে।

ব্যক্তিগত কষ্ট যেন আড্ডার উপকরণ না হয় : কারও ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিষয় এমন থাকে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা করার আগে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সংকট, দাম্পত্য সমস্যা, সন্তান ধারণ নিয়ে জটিলতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত কোনো কষ্ট— এসব তথ্য কারও অনুমতি ছাড়া অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া নিছক গল্প বলা নয়।একজন বন্ধু হয়ত বিশ্বাস করে কোনও কথা বলেছেন। সেই বিশ্বাসের মূল্য বোঝা যায় তখনই, যখন সেই কথা এমন মানুষের কাছে পৌঁছে যায় না, যাদের জানার কোনো প্রয়োজন নেই। কারও দুর্বল সময়কে অন্যের বিনোদনের উপকরণ বানানো বন্ধুত্বের বিশ্বাসভঙ্গগুলোর একটি কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সময়ে একবার ব্যক্তিগত কোনো তথ্য ছড়িয়ে গেলে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

যত কম মানুষ, তত কম ক্ষতি : কোনো বিষয় নিয়ে আসলেই কথা বলার প্রয়োজন হলে, শ্রোতার সংখ্যা যত কম রাখা যায় ততই ভালো। একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং একই কথা দশজনের কাছে বলা এক নয়। একইভাবে বন্ধুত্বের কোনো সমস্যায় পুরো বন্ধুমহলকে যুক্ত না করে, এমন একজনের সঙ্গে কথা বলা ভালো, যিনি পরিস্থিতি শান্তভাবে বুঝতে সাহায্য করবেন।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/183500