বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যবসায়ী নিঝুম হত্যার রহস্য উন্মোচিত

বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যবসায়ী নিঝুম হত্যার রহস্য উন্মোচিত

স্টাফ রিপোর্টার : তৃতীয় লিঙ্গের ব্যবসায়ী  বন্ধু ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম (৩৭) এর কাছ থেকে  মোটা অংকের টাকা ধার নিয়েছিল অপর দুই বন্ধু নাজিম উদ্দিন (৩০) ও  মো. স্বপন (২৮)। সেই টাকা পয়সার লেনদেন নিয়ে নিঝুমের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে নাজিম ও স্বপনের। বিরোধের জেরে কৌশলে বন্ধু স্বপনের কর্মস্থলে নিঝুমকে ডেকে নিয়ে যায় নাজিম। এরপর নাজিম ও স্বপন দুজন মিলে নিঝুমকে হত্যার পরিকল্পনা করে। হত্যাকাণ্ডের আগে নাজিম উদ্দিন তাঁর মুঠোফোনের ইন্টারনেটে গুগল সার্চ করে জানতে চায়, অজ্ঞান করার ওষুধের নাম কী? এরপর কোমলপানীয়'র সঙ্গে রাষায়নিক দ্রব্য  এবং বিষ  মিশিয়ে নিঝুমকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ বস্তাবন্দী করে গুম করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় বাবুর্চি হিসাবে কর্মরত নাজিম উদ্দিন  এবং স্বপন নিজ থেকে ইস্তফা দিয়ে গা ঢাকা দেয়।  নিখোঁজের পাঁচ দিনের মাথায় গত ১২ আগষ্ট বগুড়া মহানগরীর মালগ্রাম-শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ সড়কের পাশে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকা থেকে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতনামা একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনেরা সেই লাশ তৃতীয় লিঙ্গের নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন। নিঝুম বগুড়া মহানগরের সুত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ছেলে।

এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায়  মুঠোফোনের কললিষ্টের সূত্র ধরে নাজিম ও স্বপনকে শনাক্ত করা হয়।  হত্যাকাণ্ডের আগে নাজিম ও স্বপন দুজনই নিঝুমের সঙ্গে কথা বলেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় একমাস পর গত বুধবার বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে তৃতীয় লিঙ্গের নিঝুম হত্যা মামলা দায়ের হয়। পুলিশ সেই মামলায় সন্ধিগ্ধ আসামী হিসাবে কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে নাজিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করে। নাজিম উদ্দিন মদনাই গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি নাজিম উদ্দিন স্বীকার করে, হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি মুঠোফোনের ইন্টারনেটে গুগল সার্চ করে জানতে চেয়েছিল, অজ্ঞান করার ওষুধের নাম কী? এরপর কোমলপানীয়'র সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্য এবং বিষ  মিশিয়ে নিঝুমকে হত্যা করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা ও বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক মো. শরিফুল ইসলাম গত বুধবার বিকালে আসামি নাজিম উদ্দিনকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালতের বিচারক  ও বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: আরিফুল ইসলাম  আসামীর পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

মামলার এজাহার এবং গ্রেপ্তার আসামীর প্রাথমিক স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তৃতীয় লিঙ্গের ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম বগুড়া মহানগরীর ষ্টেশন সড়কে তার বাবা রফিকুল ইসলামের সঙ্গে নিঝুম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ফলের আড়তের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। নিঝুমের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) আশা-তে বাবুর্চি পদে কর্মরত নাজিম উদ্দিন ও মো. স্বপনের। কিছুদিন আগে নিঝুম তাঁর মা রঞ্জনা বেগমের নামে আশা এনজিও থেকে ব্যবসার কাজে সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। এই টাকার মধ্যে ব্যবসার কাজে বাবার হাতে দেন তিন লাখ টাকা। অবশিষ্ট চার লাখ টাকার মধ্যে  বন্ধু স্বপনকে  দুই লাখ এবং নাজিম উদ্দিনকে এক লাখ টাকা ধার দেন। ধারের টাকার লেনদেন নিয়ে এক পর্যায়ে নিঝুমের সঙ্গে নাজিম ও স্বপনের বিরোধ বাঁধে।

স্বজন ও পুলিশের দাবী, কর্জের টাকা নিয়ে সেই বিরোধের জেরে স্বপন এবং নাজিম দুজন মিলে নিঝুমকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৭  আগষ্ট শুক্রবার নিঝুমকে ডেকে নিয়ে নাজিম উদ্দিন মালগ্রাম এলাকায় আশার কার্যালয়ে যায়। সেখানে কোমল পানীয়'র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে নিঝুমকে হত্যা করে। পরে লাশ বস্তায় ভরে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকায় গুম করে রাখে। ৮ আগষ্ট সকালে আশা কার্যালয় থেকে নাজিম ও স্বপন বের হয়ে যায়।  ওই দিনই  তারা আশা থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়ে গা ঢাকা দেয়।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের পর স্বজনেরা তা তৃতীয় লিঙ্গের ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন। পরে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। বুধবার  বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামী করে নিঝুমের ভাই সোহেল হোসেন বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

 

 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/183248