২৪৫ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, যুক্তরাষ্ট্রে দোষ স্বীকার সিঙ্গাপুর তরুণের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা আদালতে স্বীকার করেছেন সিঙ্গাপুরের এক তরুণ। ২৪৫ মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন চুরি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলায় দোষ স্বীকার করেছেন ২২ বছর বয়সী ম্যালোন লাম।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র পরিচালনার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন তিনি। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে তার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) জানিয়েছে, ম্যালোন লাম তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিটকয়েন চুরি করেন এবং পরে বিভিন্ন উপায়ে সেই অর্থ পাচার করেন।
চুরি করা অর্থ দিয়ে লাম ও তার সহযোগীরা অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করতেন। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্যানুযায়ী, তারা রাতের ক্লাবে এক সন্ধ্যায় ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ করতেন।
এছাড়া ১ লাখ থেকে ৩৮ লাখ ডলার মূল্যের বিলাসবহুল ও বিরল মডেলের গাড়ির একটি বহরও কিনেছিলেন তারা।
সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের মুখে
লাম দোষ স্বীকার করলেও তার সাজা ঘোষণার দিনক্ষণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করেননি মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ কোলিন কোলার-কোটেলি।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনিন পিরো বলেন, ‘‘আপনি যদি সাইবার অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করব, আপনার অপরাধচক্র ধ্বংস করব এবং আইনের আওতায় আনব।’’
তিনি বলেন, এই আসামি একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা প্রতারণার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের লক্ষ্যবস্তু বানাত, তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করত এবং শত শত মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করত।
১৪ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে
তদন্তকারীদের কাছে লাম জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে তিনি ১৪ বছর বয়সে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরের বছরের জানুয়ারিতে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যান।
আদালতের নথি অনুযায়ী, অপরাধী চক্রটির কার্যক্রম অন্তত ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত চলেছে।
এই চক্রের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, কানেকটিকাট, নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কয়েকটি দেশের বাসিন্দা ছিলেন। তাদের পরিচয় হয়েছিল অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
অনলাইন প্রতারণা থেকে বাড়িতে চুরি
ডিওজে জানিয়েছে, ম্যালোন লামই ছিলেন এই অপরাধী চক্রের মূল হোতা। তিনি বিভিন্ন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতেন এবং চক্রের সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন।
লাম বিভিন্ন সময়ে ‘অ্যান হ্যাথাওয়ে’, এবং ‘কিং গ্রেভি’ নামেও পরিচিত ছিলেন বলে জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
চক্রের সদস্যরা প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে গোপন ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের বাড়িতে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের ঘটনাও ঘটেছে।
এসব তথ্য ব্যবহার করে তারা ভুক্তভোগীদের ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত।
বিলাসবহুল গাড়ি, ঘড়ি ও ব্যক্তিগত জেট
চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সির অর্থ দিয়ে লাম ও তার সহযোগীরা বিলাসী জীবনযাপনের এক নজিরবিহীন আয়োজন করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
তাদের কেনাকাটার তালিকায় ছিল লাখ লাখ ডলার মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি, দামি ঘড়ি, পোশাক এবং বিভিন্ন বিলাসপণ্য।
ডিওজের তথ্যানুযায়ী, তারা হেরমেসের বিখ্যাত বারকিন হ্যান্ডব্যাগও কিনেছিলেন, যার প্রতিটির মূল্য ছিল কয়েক লাখ ডলার। এসব ব্যাগ তারা নাইটক্লাবের পার্টিতে উপস্থিত মানুষের ভিড়ের মধ্যে ছুড়ে দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চুরি করা অর্থে তারা ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত মূল্যের বিলাসবহুল ঘড়ি কিনেছিলেন। এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলেস, হ্যাম্পটনস ও মায়ামিতে ব্যয়বহুল বাড়ি ভাড়া নেন তারা।
ব্যক্তিগত জেট ভাড়া করে ভ্রমণ এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলও নিয়োগ করেছিলেন এই অপরাধচক্রের সদস্যরা।
নাইটক্লাবের জগতে ‘কুখ্যাত’ লাম
তার আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনের কারণে লস অ্যাঞ্জেলেস ও মায়ামির নাইটক্লাব অঙ্গনে ম্যালোন লাম ব্যাপক পরিচিত ও কুখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে তার বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ওঠা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোরও নজর কেড়েছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এফবিআইয়ের এজেন্টরা লাম এবং তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করলে অপরাধচক্রটির পতন শুরু হয়।
লামকে প্রথমবার আদালতে হাজির করার সময় মার্কিন ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক অ্যালিসিয়া ভ্যালে তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ১৯৮৬ সালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘ফেরিস বুয়েলারস ডে অফ’-এর একটি নেতিবাচক সংস্করণের তুলনা করেন।
তিনি বলেন, মামলার প্রমাণ শুনতে গিয়ে তার মনে হচ্ছিল, এটি যেন ‘বিপথে যাওয়া ফেরিস বুয়েলার’-এর গল্প।
বিচারক বলেন, লাম বিপুল অর্থ হাতে পাওয়ার পর বেপরোয়া জীবনযাপন শুরু করেন। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের বিভিন্ন নাইটক্লাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন এবং ৩০টিরও বেশি উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি কেনেন।
বিচারকের ভাষায়, ২৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ হাতে আসার পর যে মাত্রার ব্যয়বহুল ও উন্মত্ত জীবনযাপন শুরু হয়েছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য।
সহযোগীর ৭০ মাসের কারাদণ্ড
এই অপরাধচক্রের অন্যতম সদস্য ইভান ট্যাঙ্গেম্যানকে চলতি বছরের এপ্রিলে ৭০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি অপরাধচক্রের চুরি করা অর্থ পাচারে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।
ম্যালোন লাম গ্রেফতার হওয়ার পর ট্যাঙ্গেম্যান প্রমাণ নষ্ট করারও চেষ্টা করেছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ বলেছে, আদালত তার এই কর্মকাণ্ডকে নিজের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
ক্রিপ্টো অপরাধে নতুন সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল যে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিপুল সম্পদ ও ডিজিটাল ওয়ালেট নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোর বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অপরাধীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং অর্থ পাচারের সমন্বয়ে এই চক্রটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
ম্যালোন লামের দোষ স্বীকারের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত এই বিশাল ক্রিপ্টো চুরির মামলায় নতুন মোড় এসেছে। এখন আদালতের রায়ে তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
দোষ স্বীকার করায় তার সাজা কমানোর সুযোগ থাকলেও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় লাম দীর্ঘ কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/183083