ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত অর্থনীতি বিকশিত হোক

ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত অর্থনীতি বিকশিত হোক

প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে চান, পদে পদে ঘুষ দাবি, প্রতিবাদে নিজেই 'ঘুষ. সাইট' নামের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করলেন কিশোর শাহেদ শরীফ। এ বছর ২১ আগষ্ট চালু হওয়া এই উদ্যোগ সারাদেশে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সম্প্রতি খোঁজ নিয়েছে এই কিশোরের। আর গত মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে ডেকে শরীফের সাথে কথা বলেছেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান। দৈনিক করতোয়া পরিবারের পক্ষ থেকে আমরাও এই অসাধারণ ও জনহিতকর উদ্যোগের জন্য শরীফকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাই। আমরা শরীফের উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি। 'ঘুষ' নেয়াটা একটা সময় ছিল লজ্জার! এখন সেটা যোগ্যতা। 

আমাদের মনোজগত এখন ঘুষভিত্তিক এবং ঘুষ না খাওয়াটাই এখন 'অযোগ্যতা'। সরকারি চাকুরিজীবী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, স্থানীয় সরকার, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়, প্রায় সবখানেই ঘুষ ও দুর্নীতি প্রচন্ড প্রতাপে জায়গা করে নিয়েছে। ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে কথা বলা, তাদের টিকি স্পর্শ করারও যেন সাধ্য কারও নেই। এত ক্ষমতাধর এই দৈত্যের বিরুদ্ধে সামান্য এক কিশোর শরীফের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকুক এই প্রত্যাশা করছি। উদ্যমী কিশোর শরীফের উদ্যোগের চালু হওয়া 'ঘুষ. সাইট' ভাইরাল হয়েছে কিন্তু দেশের কোথাও ঘুষ বন্ধে তা ভূমিকা রেখেছে কিনা তা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে কোন আলোচনা বা সংবাদ আমি দেখিনি। 

ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে 'কী করতে হবে' সেটা নিয়ে অবশ্য অনেক আলোচনা ও পরামর্শ বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, পড়েছি কিন্তু কোন ফল হয়েছে এমন কথা শুনিনি। কারণ বেড়া নিজেই যে ক্ষেতের ফসল খায়! সর্ষের ভেতরেই যদি 'ভূত' থাকে তাহলে ভূত তাড়াবে কে? আমার বুদ্ধির বয়স থেকে আজ অবধি যতগুলো সরকার আমি দেখলাম তাদের সবাই ক্ষমতায় এসেই ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জেহাদ' বা 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেছেন কিন্তু ফলাফল? সে তো আপনারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও চারপাশের বাস্তবতা থেকেই জানেন! কেন এই ঘুষ দৈত্য এতটা ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদদের পশয়ে? আমলাদের দুর্নীতি'র কারণে? নাকি সমাজ এটা মেনে উত্তর নিয়েছে? হয়তো একটা নয়, হয়তো সবগুলোই কিন্তু ডিম আগে নাকি মুরগী আগে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে ১০০% থেকে ১৪২% শতাংশ পর্যন্ত। তা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি বেড়েছে। কারণ, বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৫ হাজার আর শূন্য পদের সংখ্যা ৫ লাখ ২১ হাজার অর্থাৎ মোট প্রায় ১৯ লাখ ৮৬ হাজার বা বিশ লাখ মাত্র।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের এই বিপুল বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে জন-জীবন কিভাবে মূল্যস্ফীতির চাপে চ্যাপ্টা হবে সেটা নিয়ে গণমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু এখানে জনগণের পক্ষ থেকে যে দুটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে, (১) এর ফলে কি সরকারি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতি কমবে এবং (২) এর ফলে কি সরকারি অফিসে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে? অতীতের সরকারদের বেতন বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা বলছে, না তা হবে না। কারণ সমস্যা বেতনের পরিমাণে নয়, সমস্যা হলো জবাবদিহিতা ও বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি। আমাদের দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি তাদের ঘুষের টাকায় যে সম্পদ কিনেন বা অর্জন করেন, তা সাধারণত: তাদের স্ত্রী বা সন্তানদের নামে দলিল করেন। এটা সরকার ও দুর্নীতি দমন বিভাগ সবাই জানেন। একজন গৃহবধূ বা তাদের সন্তানগণ কোন পেশা থেকে কিভাবে এত সম্পদ অর্জন করেন সেই প্রশ্নটা কি করা যায় না? এটা যদি আইনের দুর্বলতা হয় তাহলে আইন কেন সংশোধন করা হচ্ছে না? বাংলাদেশের নতুন সরকার চরম এক আর্থিক সংকট মোকাবেলা করছে।

বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলসহ জ্বালানীর দাম ঊর্ধ্বমুখী। দেশের ভেতরে বিদ্যুৎ সংকট চরমে। বাড়ছে খেলাপি ঋণ। যে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে আমরা গর্বিত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটাও রয়েছে ঝুঁকিতে। আর বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাড়ছে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা, যা আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তৈরি করছে আস্থার সংকট। এতসব কিছুর মধ্যেও এখনই কেন সরকারকে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে হলো সেটা আমজনতার বোধগম্য নয়। শেখ হাসিনা সরকার নাকি সরকারি আমলাতন্ত্র নির্ভর ছিলেন। তিনি দলের চেয়ে আমলাতন্ত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতেন বলেই নাকি দেশের রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। কারণ, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়, আর এই প্রক্রিয়ায় আস্থায় রাখতে হয় জনগণকে। জনমনে ক্ষোভ যদি বাড়ে, জনগণ যদি সরকারি ব্যবস্থাপনার উপর অসন্তুষ্ট হয় তাহলে সেটা আমলাদের দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না।

 শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল এমনকি ভারতেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এতকিছুর পরেও কেন সরকারকে জনগণের উপর করের বোঝা বাড়িয়ে, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি তথা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে কোন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে? অদৃশ্য চাপটা কে দিচ্ছে, কিসের পরিকল্পনা অনুসারে? দেশের মানুষ আশঙ্কা করছে সামনের শীত মৌসুমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত থাকবে। সেই তাপ ও চাপ সামলাতে সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেটা জনগণকে সাথে নিয়েই। মানুষ সরকারের উপর আস্থা হারাতে পারে এমন পদক্ষেপ থেকে সাবধান থাকতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতি থেকে মুক্ত হয়ে বিকশিত করতে হবে দেশের উৎপাদন ও উন্নয়নের অর্থনীতিকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/182760